ঢাকা, রবিবার   ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯, || পৌষ ২ ১৪২৬

Ekushey Television Ltd.

আল্লাহর সর্বাধিক নৈকট্যশীল হবেন যেভাবে

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ১৭:৫৯ ৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯

অক্সিজেন যেমন দেহকে সতেজ ও জীবিত রাখে তেমনি জিকির বা আল্লাহর স্মরণ আত্মাকে সতেজ রাখে। যে জিকির বা আল্লাহর স্মরণ করে না তার আত্মা মৃত আর যে জিকির করে তার আত্মা জীবিত।

স্রষ্টার স্মরণ মানুষের এত কল্যাণকর বিধায় আল্লাহতায়ালা তার রাসূলকে (সা.) স্রষ্টার স্মরণের নির্দেশ দিয়েছেন- ‘সুতরাং আপনি আপনার পালনকর্তার জিকির করতে থাকুন এবং একাগ্রচিত্তে তারই প্রতি মগ্ন হয়ে থাকুন।’ (সূরা মুজাম্মিল ৭৩/৮)

বিশ্বাসীদেরও আল্লাহ তাঁর স্মরণে মগ্ন থাকার নির্দেশ দিয়েছেন- ‘হে বিশ্বাসীগণ, বেশি বেশি আল্লাহর জিকির করুন এবং সকাল-সন্ধ্যা তার পবিত্রতা বর্ণনা করুন।’ (সূরা আহযাব ৩৩/৪১) আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও বলেন : ‘জেনে রাখো আল্লাহর স্মরণ এমন জিনিস, যা দ্বারা হৃদয় পরম শান্তি ও স্বস্তি লাভ করে।’ (সূরা রাদ ১৩/১৮)

মুখে কোন কথা নেই, ঠোঁটে কোনো উচ্চারণ নেই, কারো দিকে তাকাবার প্রয়োজন নেই, কিছু চাওয়ার উৎসাহ নেই, কিছু না-পাওয়ার হাহাকার নেই। হৃদয় মগ্ন প্রভুর জিকিরে। এই হৃদয়ে প্রভুর উপস্থিতি প্রতিক্ষণ আর প্রভুর সঙ্গে নীরব আলাপন চলছে সারাক্ষণ।

দুনিয়ার মানুষ এইসব জিকিরকারীর খবর রাখে না কিন্তু ফেরেশতাগণ ঠিকই খবর রাখেন। সারাক্ষণ ফেরেশতাদের একটা জামায়াত জিকিরকারীদের সন্ধানে ঘুরতে থাকেন এবং যেখানে জিকির হয় সেই স্থানগুলোকে অতি সহজে তারা চিনতে পারেন।

যেখানে আল্লাহর জিকির হয় সেই স্থানকে ফেরেশতারা ঘিরে রাখেন। এ সম্পর্কে হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, যেসব ঘরে আল্লাহর জিকির হয় সেগুলোকে আকাশের বাসিন্দারা এমন চাকচিক্যময় দেখে, যেমন পৃথিবীর বাসিন্দারা তারকাসমূহকে চাকচিক্যময় দেখে। (ইবনে মাজা)

জিকির দিলের যাবতীয় রোগের চিকিৎসা। চুম্বক যেমন লোহা আকর্ষণ করে, জিকির তেমনি আল্রাহর রহমত আকর্ষণ করে। জিকির আল্লাহর মহব্বত তৈরি করে। জিকির দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য হাসিল হয়। 

‘হে নবী! তোমার রবকে সকাল ও সন্ধ্যায় স্মরণ করতে থাকো হৃদয়ে বিনয় ও প্রীতি সহকারে এবং অনুচ্চ ধ্বনিতেও। তুমি সেই লোকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না যারা চরম গাফিলতির মধ্যে পড়ে আছে।’ (সূরা আরাফ ৭/২০৫)

যার অন্তরে স্রষ্টার স্মরণ (ওম) জারি হয়েছে সেই স্বর্গীয় জ্যোতির ছায়াতলে অনন্তকাল থাকবে। এ সম্পর্কে ঋগবেদে আছে ‘স্বর্গীয় জ্যোতি ও আনন্দ উপলব্ধির প্রতীক ‘ওম’ স্থাপিত হোক তোমাদের হৃদয়ে অনন্তকালের জন্য।’
(ঋগবেদ : ২.১৩) 

জিকির হলো নূর বা আলো। যে যত জিকির করে তার আত্মার নূর তত উজ্জ্বল হয়। এই নূর সব সময় জিকিরকারীর সঙ্গে থাকে। মৃত্যুর পর যখন সব আত্মীয়-স্বজন তাকে ছেড়ে চলে যায় তখনও সে সঙ্গে থাকে এবং কবর ও পুলসিরাতে সে অগ্রভাগে চলতে থাকে।

ভ্যাকসিন যেমন জীবাণুকে শরীরে ঢুকতে দেয় না তেমনি জিকির কুচিন্তাকে, অশ্লীলতাকে, নেতিবাচকতাকে মনের ভেতরে ঢুকতে দেয় না। লেজার রশ্মি যেমন অতিদামি রত্নে চারদিক প্রতিরক্ষা বলয় তৈরি করে তেমনি জিকির শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে মনকে সুরক্ষা দেয়। তাই প্রতিটি কাজ ও ব্যবসার মধ্যে, রোগী দেখার ব্যস্ততার মধ্যেও অন্তরে আল্লাহর স্মরণ জারি রাখতে হবে।

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ তার নাম স্মরণের জন্য সেসব গৃহকে মর্যাদায় উন্নীত করেছেন যেখানে সকাল-সন্ধ্যায় তার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষিত হয়। সেসব লোক যাদের ব্যবসা বাণিজ্য এবং ক্রয়-বিক্রয় আল্লাহর স্মরণ থেকে এবং নামাজ কায়েম করতে ও যাকাত দিতে বিরত রাখে না। তারা ভয় করে সেই দিনকে যেদিন অন্তর ও দৃষ্টিসমূহ উল্টে যাবে।’ (সূরা নূর ২৪/৩৬-৩৭)

হযরত আলী (রা.) বলেন, নিশ্চয়ই মহিমান্বিত আল্লাহ তাঁর জিকিরকে মানুষের হৃদয়ের জন্য আলো করে দিয়েছেন যা দ্বারা বধিরতা সত্ত্বেও সে শুনতে পায়, অন্ধত্ব সত্ত্বেও দেখতে পায় এবং অদম্যতা সত্ত্বেও অনুগত হয়। কিছু কিছু লোক আছে যারা জাগতিক কর্মকাণ্ডের পরিবর্তে আল্লাহর জিকিরে এমনভাবে মগ্ন যে, ব্যবসা-বাণিজ্য কোনো কিছুই তাদেরকে এ ধ্যান থেকে ফিরিয়ে আনতে পারে না। তারা আল্লাহর জিকিরে জীবন কাটিয়ে দেয়।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে বুসর (রা.) বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তি রাসূলে করীম (সা.)-এর খেদমতে আরয করল, হে আল্লাহর নবী, সওয়াবের কাজ তো অনেক। সবগুলো পালন করা আমার সাধ্যাতীত। আমাকে এমন কোনো বিষয় বলে দিন যা আমি শক্তভাবে আঁকড়ে থাকব এবং তাই পালন করব। তিনি বললেন (এ অভ্যেস গড়ে তোল) তোমার রসনা যেন আল্লাহর জিকির দ্বারা সিক্ত থাকে। (তিরমিযি ৩৩১১)

রাসূল (সা.) বলেন, আমি কি তোমাদের সর্বোত্তম কাজের কথা বলব যা প্রভুর চোখে অত্যন্ত প্রিয় ও উচ্চ মর্যাদায় এমনকি আল্লাহর পথে সোনা-রূপা দান করা বা আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ ক্ষেত্রে মোকাবিলার চাইতে উত্তম? তারা বললেন ‘হ্যাঁ’। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, আল্লাহর স্মরণ। (তিরমিযি ৩৩১২)

হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.)কে প্রশ্ন করা হলো, বান্দাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ এবং কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে সর্বাধিক নৈকট্যশীল কে? তিনি বললেন, যে পুরুষ প্রচুর পরিমাণে আল্লাহর জিকির করে। যে নারী বেশি পরিমাণে আল্লাহর জিকির করে। (তিরমিযি, ইবনে মাজাহ)

তাহলে তারাই সৌভাগ্যবান যাদের হৃদয়ে থাকে জীবনের শেষ মুহূর্তে আল্লাহর নাম। আর তখনই মৃত্যুর সময় আল্লাহর নাম স্মরণে থাকবে যখন একজন মানুষ প্রতি মুহূর্তে আল্লাহকে স্মরণ করতে অভ্যস্ত হবে। কেননা মৃত্যু যে কোনো মুহূর্তে আসতে পারে, এমন কি ঘুমের মধ্যে আত্মা চলে যেতে পারে মহাপ্রভুর কাছে।

এএইচ/এসি
 

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি