ঢাকা, সোমবার   ২১ অক্টোবর ২০১৯, || কার্তিক ৭ ১৪২৬

Ekushey Television Ltd.

ইবতেদায়ি শিক্ষকদের জন্য সুখবর

প্রকাশিত : ১১:৩৫ ১৮ জুন ২০১৯

প্রথমবারের মতো এমপিওভুক্ত করা হবে সারাদেশের ৪ হাজার ৩১২টি ইবতেদায়ি মাদ্রাসা। এতে এসব মাদ্রাসায় কর্মরত প্রায় সাড়ে ২১ হাজার শিক্ষকের চালু হবে সরকারি বেতন। বর্তমানে এসব মাদ্রাসার শিক্ষকরা কোনো বেতন পান না।

সরকার থেকে তিন মাস পর পর নামমাত্র ভাতা পান তারা। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ এসব মাদ্রাসায় অনুদান বিতরণের পরিবর্তে এমপিওভুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে।

যদিও সারাদেশে ইবতেদায়ি মাদ্রাসা ও শিক্ষকের সংখ্যা আরও বেশি। তবে প্রথম দফায় সবাইকে একসঙ্গে এমপিওভুক্ত করা সম্ভব না হওয়ায় আপাতত ৪৩১২টি মাদ্রাসাকে এমপিওভুক্তির জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এরই মধ্যে এ বিষয়ে অনুমোদন দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

কারিগরি ও মাদ্রাসা বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গতবারের চেয়ে ২০১৯-২০২০ সালের প্রস্তাবিত বাজেটে এ বিভাগের বরাদ্দ বেশি পাওয়ায় দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ইবতেদায়ি মাদ্রাসাগুলোর শিক্ষকদের সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এসব মাদ্রাসার শিক্ষকরা ৩৪ বছর ধরে কোনো বেতন পান না। জাতীয় বেতন স্কেলের অধীনে অন্তর্ভুক্ত হতে দীর্ঘদিন রাজপথে আন্দোলন করছেন তারা।

তাদের এমপিওভুক্ত করার জন্য এরই মধ্যে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ থেকে জানা গেছে। সূত্র জানায়, সারাদেশের নতুন ৩ হাজার মাধ্যমিক পর্যায়ের স্কুল ও মাদ্রাসা এবং উচ্চস্তরের কলেজ-মাদ্রাসা এমপিওভুক্তির বিষয়টি এরই মধ্যে অনুমোদন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেগুলোর সঙ্গে ৪ হাজার ৩১২টি ইবতেদায়ি মাদ্রাসা এমপিওভুক্ত করার সার-সংক্ষেপও অনুমোদন করেছেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর কাছে মন্ত্রণালয় থেকে উপস্থাপিত এ সংক্রান্ত সার-সংক্ষেপে বলা হয়, স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসার জন্য আলাদা পরিচালনা নীতিমালা-২০১৮ ইতিমধ্যে তৈরি করা হয়েছে। যদিও বর্তমান এমপিও নীতিমালায় স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা অন্তর্ভুক্ত নেই। তবু এ ধরনের প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে ৩১০ কোটি ৯৭ লাখ ৭১ হাজার ২৮০ টাকা প্রয়োজন হবে বছরে।

একমাস আগে গত ৮ মে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এ প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই প্রস্তাব গত ১২ জুন অনুমোদন করেছেন। এর ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের ৫ জন করে মোট ২১ হাজার ৫৬০ শিক্ষকের কপাল খুলে গেছে। সাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিবন্ধিত ইবতেদায়ি প্রতিষ্ঠানগুলোও এখন এমপিওভুক্ত করা হবে।

কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ সূত্র সমকালকে জানায়, প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন পাওয়ায় এখন ইবতেদায়ি মাদ্রাসাকেও এমপিওভুক্তির নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এসব মাদ্রাসা এমপিওভুক্তি করা হলে শিক্ষকরা মাসিক জাতীয় বেতন স্কেলের বিভিন্ন গ্রেডে বেতন পাবেন। সে অনুযায়ী মাদ্রাসার প্রধানরা (মাদ্রাসা সুপার) ১১ কোডে ১২ হাজার ৫০০ টাকা স্কেলে পাবেন।

এ ছাড়া দেড় হাজার টাকা বাড়ি ভাড়া ও চিকিৎসা ভাতা এবং ২৫শ` টাকা বৈশাখী ও ৬ হাজার ২৫০ টাকা উৎসবভাতা পাবেন। আর মৌলভীরা পাবেন ১৬ কোডে ৯ হাজার ৩০০ টাকা করে। এ ছাড়া মাসে বেতনের সঙ্গে দেড় হাজার টাকা করে বাড়ি ভাড়া ও চিকিৎসা এবং ১ হাজার ৮৬০ টাকা করে বৈশাখী ও ৪ হাজার ৬৫০ টাকা উৎসবভাতা পাবেন।

মাদ্রাসা শিক্ষার প্রাথমিক স্তরকে বলা হয় `ইবতেদায়ি।` আর স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা হলো যেগুলোর সঙ্গে মাধ্যমিক (দাখিল) শাখা সংযুক্ত নেই। কিছু কিছু মাদ্রাসায় সরকার নামমাত্র অনুদান দেয়। সারাদেশের প্রায় ১০ হাজার মাদ্রাসার মধ্যে মাত্র ১ হাজার ৫১৯টি মাদ্রাসার ৪ জন করে শিক্ষক সরকার থেকে ২৩০০ টাকা করে ভাতা পান। আর প্রধান শিক্ষকদের ভাতা ২৫০০ টাকা। তাও পান তিন মাস পর পর।

অবশিষ্ট মাদ্রাসার শিক্ষকরা কোনো ধরনের আর্থিক সুযোগ-সুবিধাই পান না। প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসাগুলোতে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থী লেখাপড়া করে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালিত হয়।

স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসায় প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হলেও প্রাথমিক শিক্ষা খাতে বরাদ্দ অর্থ ও সুযোগ-সুবিধা এসব প্রতিষ্ঠান পায় না। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।

জানা গেছে, সারাদেশের ৮ হাজার ৫০০টি স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসায় বর্তমানে ৩৪ হাজার শিক্ষক চাকরি করছেন। এগুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ।

`বাংলাদেশ স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা শিক্ষক সমিতি`র নেতারা সমকালকে জানান, স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা ও প্রাইমারি শিক্ষকদের ১৯৯৪ সালে এক পরিপত্রে ৫০০ টাকা বেতন নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে নিবন্ধিত ২৬ হাজার ১৯৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করা হয়। কিন্তু ১৮ হাজার ৫১৯টি মাদ্রাসার শিক্ষকরা মানবেতন জীবনযাপন করে আসছেন। এরই মধ্যে সাড়ে আট হাজার মাদ্রাসা বন্ধ হয়ে গেছে।

সংগঠনের সভাপতি আলহাজ কাজী রুহুল আমিন চৌধুরী সমকালকে বলেন, `২০১৩ সালে মহাজোট সরকার ১ হাজার ৫১৯টি প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রত্যেক শিক্ষককে এক হাজার টাকা সম্মানী ও ২০০ টাকা করে মহার্ঘ্যভাতা ঘোষণা করে। গত বছর তা ২৩০০ ও প্রধান শিক্ষকদের ২৫০০ টাকায় উন্নীত করা হয়।

এসব শিক্ষক সামান্য এই অর্থ পেলেও আরও প্রায় সাড়ে আট হাজার নিবন্ধিত মাদ্রাসার শিক্ষকরা বিনা অর্থে শ্রম দিচ্ছেন। বর্তমানে শিক্ষকরা খেয়ে-না খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন। এ অবস্থায় আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে।`

মানিকগঞ্জের ঘিওর মদিনাতুল উলুম ইবতেদায়ি মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা রফিকুল ইসলাম বলেন, `বর্তমান সময়ে কোনো মানুষের পক্ষে ২৩শ` টাকায় জীবনধারণ করা যায় না। একজন দিনমজুরও মাসে নয় থেকে ১০ হাজার টাকা আয় করেন।` তিনি আকুতি জানিয়ে বলেন, তাদের সংসার আছে, সন্তান আছে, তারাও একটু ভালোভাবে বেঁচে থাকতে চান।

আরেক শিক্ষক মাওলানা আজিজুল হক বলেন, `ইবতেদায়ি মাদ্রাসাগুলো কীভাবে চলছে কেউই জানে না। এসব মাদ্রাসার শিক্ষকদের বর্তমানে কোনো বেতন নেই, তাদের বেতন পাওয়ার অধিকার নেই। মাদ্রাসাগুলোতে শিক্ষাসামগ্রী ও আসবাবপত্র নেই, রেজিস্ট্রেশন নেই।

তারা ৩৩ বছর ধরে শুধুই অবহেলিত। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা আর এখানে থাকতে চান না। ইবতেদায়ি মাদ্রাসায় শিক্ষকও খুঁজে পাওয়া যায় না। তারা কত টাকা বেতন পান, তা কাউকে বলাও লজ্জাজনক। এমপিওভুক্ত হলে তারা প্রাণে বেঁচে যাবেন।`

জানা গেছে, গত কয়েক বছর ধরেই ইবতেদায়ি মাদ্রাসার শিক্ষকরা বেতন বৃদ্ধির দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছেন। সরকারের তরফ থেকে কয়েকবার আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে তা পূরণ করা হয়নি। এবার তা পূরণ করা হচ্ছে।

মাওলানা নজরুল ইসলাম নামের এক শিক্ষক জানালেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক বিদ্যালয়ে যে সিলেবাসে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করান, ইবতেদায়ি শিক্ষায় একই সিলেবাস তারা পড়ান। তবে এর বাইরে আরবিসহ ধর্মীয় কিছু সিলেবাসে তারা বেশি পাঠদান করে থাকেন। কিন্তু প্রাথমিক শিক্ষকদের চেয়ে বেশি পাঠদান করেও তারা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।

তিনি বলেন, প্রাথমিক শিক্ষকরা একই সিলেবাসে পাঠদান করিয়ে বর্তমান স্কেলে ১৫ হাজার বেতন পাচ্ছেন। আর তারা পাচ্ছেন ২৩শ` টাকা। যা নিতান্তই বৈষম্য। তারা জানান, এই টাকা দিয়ে অভাব-অনটনের সংসার আর চলে না। প্রধানমন্ত্রীর সদয় কৃপায় এবার নিশ্চয়ই এই শিক্ষকদের ভাগ্যের চাকা ঘুরবে।

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি