ঢাকা, মঙ্গলবার   ২৭ অক্টোবর ২০২০, || কার্তিক ১২ ১৪২৭

Ekushey Television Ltd.

থাইল্যান্ডে রাজতন্ত্রের বিরোধিতা করার সাহস দেখালেন যে ছাত্রী

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ০০:০৮ ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০

পানুসায়া সিথিজিরাওয়াত্তানাকুল রাজতন্ত্রের সংস্কার দাবি করে অগাস্ট মাসে দশ দফা ঘোষণাপত্র দেন

পানুসায়া সিথিজিরাওয়াত্তানাকুল রাজতন্ত্রের সংস্কার দাবি করে অগাস্ট মাসে দশ দফা ঘোষণাপত্র দেন

‘‘আমার মনের ভেতর একটা ভয় কাজ করছিল, পরিণতি নিয়ে গভীর শঙ্কায় ছিলাম,'' বলছেন পানুসায়া সিথিজিরাওয়াত্তানাকুল। অগাস্ট মাসে ২১ বছর বয়সী এই ছাত্রী থাইল্যান্ডের এক মঞ্চে বেশ ভয়ে ভয়ে উঠে দাঁড়ান এবং রাজতন্ত্রের প্রতি খোলাখুলি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন।

থাইল্যান্ডের শীর্ষস্থানীয় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার হাজার শিক্ষার্থীর করতালির মধ্যে দিয়ে ওই মঞ্চে পানুসায়া দেশটির রাজতন্ত্রের সংস্কারের লক্ষ্যে যে দশ দফা দাবি তুলে ধরেছিলেন, তা এখন দেশটিতে বহুল আলোচিত ও বিখ্যাত দশ-দফা ম্যানিফেস্টো নামে পরিচিত হয়ে গেছে।

তার ওই পদক্ষেপ ছিল খুবই সাহসী ও অবাক করে দেয়ার মত। থাইল্যান্ডে জন্মের পর থেকে প্রত্যেককে শিখতে হয় কীভাবে রাজতন্ত্রকে ভালবাসতে হবে, শ্রদ্ধা করতে হবে এবং থাই রাজপরিবারের বিরুদ্ধে কিছু বললে তার পরিণতি কী হতে পারে।

'জীবন আর আগের মত থাকবে না'

পৃথিবীতে খুব কমই দেশই আছে যেখানে রাজপরিবারকে অসম্মান করার জন্য আইন আছে। থাই আইনে রাজা, রানি, রাজ সিংহাসনের উত্তরাধিকারী বা রাজ দায়িত্ব পালনকারী কারো সমালোচনা করার শাস্তি ১৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড। কিন্তু গত কয়েক মাসে থাইল্যান্ডে গণতন্ত্রকামী বিক্ষোভ হচ্ছে দেশ জুড়ে আর এই বিক্ষোভের কেন্দ্রে আছেন পানাসুয়ার মত শিক্ষার্থীরা।

"আমি জানতাম আমার জীবন আর আগের মত থাকবে না," তিনি বিবিসি নিউজ থাইকে বলেন।

রাজধানী ব্যাংককে বিরল ও বিশাল সমাবেশে এই দশ দফা দাবি পড়ে শোনানোর মাত্র কয়েক ঘন্টা আগে সেটি তাকে দেখানো হয়। এতে রাজপরিবারকে নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি দায়বদ্ধ থাকার আহ্বান জানানো হয় এবং রাজপরিবারের ব্যয়বরাদ্দ কমানোর ও রাজপরিবারকে রাজনীতিতে জড়িত না হবার প্রস্তাব দেয়া হয়। অধিকাংশ থাই নাগরিকের জন্য এই আহ্বান ছিল অভাবনীয়।

"ওরা আমার হাতে ওটা দিয়ে বলল, আমি চাইলে ওগুলো ব্যবহার করতে পারি। তখন সবারই মনে হচ্ছিল এগুলো বেশ কঠিন দাবি। আমারও সেটা মনে হয়েছিল। আমি তখন সিদ্ধান্ত নিলাম- আমিই হবো সেই ব্যক্তি যে এগুলো বলবে।

"আমি আমার বন্ধুদের হাত ধরলাম- চিৎকার করে জিজ্ঞেস করলাম -আমরা কি এখানে ঠিক কাজ করছি?" বলছিলেন পানুসায়া।

"উত্তর এল - হ্যাঁ এটা ঠিক কাজ। আমি একটু বসলাম। মঞ্চে ওঠার আগে একটা সিগারেট খেলাম। তারপর আমার মাথার ভেতর যা ঘুরছিল, সব বলে দিলাম।" মঞ্চ থেকে জনতার উদ্দেশ্যে তিনি বললেন: "সব মানুষের রক্ত লাল। আমরা আলাদা নই।

এই পৃথিবীতে কেউ নীল রক্ত নিয়ে জন্মায়নি। কেউ হয়ত বেশি ভাল ভাগ্য নিয়ে জন্মেছে। কিন্তু কেউ কারো থেকে বেশি শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে জন্মায়নি।"

পানুসায়ার ওই বক্তৃতা নিয়ে হৈচৈ সৃষ্টি হয়েছিল। মুক্তমনা শিক্ষাবিদরা তাকে করতালি দিয়ে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন, রাজতন্ত্রপন্থী সংবাদমাধ্যমগুলো নিন্দায় ফেটে পড়েছিল আর থাই জনগণ এমন বক্তব্য বিশ্বাসই করতে পারছিল না।

'নিজের দেশকে ঘৃণা করা একটা অসুখ'

ওই সমাবেশের কয়েকদিন পর রাজতন্ত্র সমর্থকদের ফেসবুক পেজ, পানুসায়ার বিরুদ্ধে আক্রমণে সোচ্চার হয়ে ওঠে। কেউ কেউ অভিযোগ করে রিপাবলিকান রাজনীতিকরা তাকে দিয়ে এসব করাচ্ছে। পানুসায়া এই অভিযোগ অস্বীকার করেন।

থাইল্যান্ড এখনও কার্যত নিয়ন্ত্রণ করে সামরিক বাহিনী। দেশটির একজন শক্তিধর জেনারেল আপিরাত কংসোমপং বলেছেন, বিক্ষোভকারীরা "দেশটির প্রতি ঘৃণা" (থাই ভাষায় "চুং চার্ট") দ্বারা আক্রান্ত। তিনি আরও বলেছেন যে, এটা "ভয়াবহ করোনা মহামারির থেকেও মারাত্মক রোগ"।

"নিজের দেশকে ঘৃণা করা একটা অসুখ যা সারানো যায় না," তিনি বলেন।

পানুসায়া বলছেন তার মনে আছে, এমনকী তিনি যখন ছোট ছিলেন তখনও তিনি থাই জীবনে রাজপরিবারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন করতেন। তার মনে আছে খুব গরমের এক দিনে, একজন কর্মকর্তা তাদের বাসার দরোজায় কড়া নেড়ে তার পরিবারকে বলেছিল বাসা থেকে বেরিয়ে রাস্তার ফুটপাতে গিয়ে বসতে, কারণ রাস্তা দিয়ে কিছু সময়ের মধ্যে রাজার গাড়িবহর যাবে।

"কেন গাড়িবহর দেখতে চড়া রোদে আমাদের আধ ঘন্টা বসে থাকতে হবে? আমার মাথায়ই আসেনি কী হচ্ছে, কেন হচ্ছে। আমি বেরিয়ে অপেক্ষমান জনতার সাথে যোগ দিইনি।"

তিন বোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট পানুসায়া। অল্প বয়স থেকেই রাজনীতিতে তার আগ্রহ ছিল। যখন হাই স্কুলে পড়তেন, তখন অবসর সময়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের সাথে রাজনীতি আলোচনা করে তিনি সবচেয়ে বেশি মজা পেতেন। ২০১৪ সালে যখন একটা অভ্যুত্থান হয়, তার বাবা তাকে এনিয়ে আরও জানতে উৎসাহ দিয়েছিলেন। পরিবারে একমাত্র তার বাবাই সেসময় রাজনীতি সচেতন ছিলেন।

তবে পানুসায়া ছোটবেলা লাজুক ছিলেন। এবং স্কুলে বড়দের হম্বিতম্বিতে তিনি মুখচোরা থাকতেন। একটা শিক্ষার্থী বিনিময় কর্মসূচিতে আমেরিকায় পাঁচ মাস কাটানোর মধ্যে দিয়ে তিনি আমূল বদলে যান।

"আমি দেশে ফিরে আসি অন্য মানুষ হয়ে। আমি তখন কথা বলতে বা কিছু করতে ভয় পেতাম না।"

প্রথম সারির বিখ্যাত থাম্মাসাত ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হবার পর তিনি রাজনৈতিকভাবে ক্রমশ আরও সক্রিয় হয়ে ওঠেন। দুবছর আগে তিনি "ডোম রেভল্যুশন" নামে ছাত্র ইউনিয়নের রাজনৈতিক দলে যোগ দেন।

ফেব্রুয়ারি মাসে, তরুণ ভোটারদের কাছে জনপ্রিয় ফিউচার ফরোয়ার্ড নামে একটি রাজনৈতিক দলকে ভেঙে দেবার পর যে আকস্মিক প্রথম গণতন্ত্রপন্থী প্রতিবাদ বিক্ষোভ হয়েছিল, তার আয়োজনে তিনি সাহায্য করেন। দলটি তাদের নেতার কাছ থেকে অবৈধভাবে অর্থ ঋণ নিয়েছিল এই রায়ের পর দলটি ভেঙে দেয়া হয়।

দলটি ২০১৯ এর নির্বাচনে ভাল ফল করেছিল। দলটির রাজনৈতিক প্রভাব বাড়তে থাকায় দলটি নিশ্চিহ্ণ করার এটি একটি প্রয়াস হিসাবে মনে করেছিল দলটির সমর্থরা। তবে সাম্প্রতিক কয়েক বছরে থাইল্যান্ডে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে যে গণতন্ত্রকামী আন্দোলন গতি পাচ্ছে তাতে তরুণ সম্প্রদায়ের যোগদানকে শুধু ওই পদক্ষেপই উৎসাহিত করেনি।

রাজা মাহা ভাজিরালংকর্ন, যিনি সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হন ২০১৬ সালে, তাকে জনসমক্ষে প্রায় দেখাই যায়নি। খবরে বলা হয়ে থাকে তিনি বেশিরভাগ সময় বিদেশে কাটান - বিশেষ করে দেশটিতে মহামারির প্রাদুর্ভাবের পর।

থাইল্যান্ডে বেশ কিছু দুর্নীতি কেলেংকারিও সামনে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে ২০১২ সালে ভয়ঙ্কর এক সড়ক দুর্ঘটনার সাথে জড়িত পানীয় প্রস্তুতকারক সংস্থা রেড বুলের মালিকের বিরুদ্ধে মামলা যেভাবে পরিচালিত হয়েছিল তা তদন্তের জন্য গঠিত সরকারি কমিটি এতে "দুর্নীতির যে ছায়া" পেয়েছিল সেটিও।

থাই সরকার বলে তারা বাক স্বাধীনতা সমর্থন করে এবং সমালোচনা গ্রহণ করতেও প্রস্তুত। কিন্তু শিক্ষার্থীদের আইনের মধ্যে থেকে তাদের অধিকার মানতে হবে এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি সৃষ্টি করলে তা মেনে নেয়া হবে না।

শিক্ষার্থীরা তাদের নিরাপত্তা নিয়ে অবশ্যই উদ্বিগ্ন। ২০১৪-য় সামরিক বাহিনীর নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের পর বিদেশে পালিয়ে যাওয়া অন্তত নয়জন যারা থাইল্যান্ডের সবচেয়ে সম্মানিত রাজতন্ত্রের সমালোচনা করেছিলেন তারা নিখোঁজ হয়ে যান। পরে এক নদীর ধারে দুজনের লাশ পাওয়া যায়।

থাই সরকার তাদের নিখোঁজ হয়ে যাবার ব্যাপারে কোনভাবে সংশ্লিষ্ট থাকার কথা জোরের সঙ্গে অস্বীকার করে। পানুসায়া বলেন যে রাতে তিনি ওই দশ দফা ম্যানিফেস্টো পড়েছিলেন, তার পর থেকে কর্তৃপক্ষ দিনরাত ক্যাম্পাসের ভেতরে, তার ডরমেটরির ভেতর তার গতিবিধি ওপর সবসময় নজর রাখছে।

"যদিও তারা সাদা পোশাকধারী, আমি বুঝতে পারি তারা পুলিশের লোক, কারণ তাদের চুলের ক্রু-ছাঁট এবং তারা প্রকাশ্য স্থানে সবসময় আমার ছবি তোলে।"

পানুসায়া বলছেন ওই ম্যানিফেস্টো পড়ার পর তার পক্ষে আর সেখান থেকে ফেরার প্রশ্ন ওঠে না। পানুসায়াকে এখনও গ্রেফতার করা হয়নি, এবং তিনি বলেছেন তিনি কখনও কর্তৃপক্ষের কাছে আত্মসমর্পণ করবেন না।

তার বিরুদ্ধে রাজতন্ত্রকে অবমাননা করার অভিযোগও আনা হয়নি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই ব্যবহৃত হয়েছে কম। তবে তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ আনা হতে পারে। এছাড়াও কম্প্যুটার নেটওয়ার্কে মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর অভিযোগ এবং রোগ নিয়ন্ত্রণ আইন লংঘনের অভিযোগও তার বিরুদ্ধে দায়ের করা হতে পারে। বলা হতে পারে তিনি করোনাভাইরাস বিধিনিষেধ ভেঙে প্রতিবাদ বিক্ষোভ করেছেন।

শুধু রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগের সাজা সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড। অন্যান্য শিক্ষার্থীদের মত পানুসায়া বাসাতেও অশান্তির মধ্যে রয়েছেন কারণ তার বিরুদ্ধে "মাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার" অভিযোগ রয়েছে ঘরেও। তার সিদ্ধান্তে পানুসায়ার মা আতঙ্কিত। তিনি তাকে সমাবেশে যোগ না দেবার জন্য অনুরোধ করেছেন। এর পর পাঁচদিন মা মেয়ে কথা বলেননি।

"অবশ্যই আমার মা উদ্বিগ্ন। কিন্তু সেটা তিনি প্রকাশ করেন না এবং আমি যখন ধারেকাছে থাকি তিনি দেখান কিছু হয়নি, সব স্বাভাবিক আছে। কিন্তু আমার বড় বোনের কাছে থাকলে তিনি কাঁদেন," পানুসায়া বলেন।

শনিবার ১৯শে সেপ্টেম্বরের সমাবেশের জন্য তিনি প্রস্তুতি নিচ্ছেন। পানুসায়া কারাবাসের জন্য মনে মনে প্রস্তুত হচ্ছেন। শনিবারের সমাবেশে রাজতন্ত্র থেকে শুরু করে সেনা বাহিনীতে, সংবিধানে, এবং শিক্ষাখাতে বিভিন্ন সংস্কারের দাবি জানানো হবে।

"আমার মাকে বুঝতে হবে আমরা মজা করার জন্য এসব করছি না। এগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এবং আমাদের এটা করতেই হবে। আমরা এটাকে আমাদের কর্তব্য বলে মনে করছি, মাকে সেটা বুঝতে হবে। আমি চাই তিনি আমার জন্য গর্ব বোধ করবেন।" সূত্র: বিবিসি বাংলা

এসি

 


New Bangla Dubbing TV Series Mu
New Bangla Dubbing TV Series Mu

© ২০২০ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি