ঢাকা, রবিবার   ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, || আশ্বিন ৮ ১৪২৬

Ekushey Television Ltd.

বঙ্গবন্ধু বললেন তুই আমাকে লিডার বলিস না: কামাল লোহানী

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ১৮:৪৪ ১৫ আগস্ট ২০১৮

টানা সাড়ে তিন মাস বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কারাগারে একই সেলে কাটিয়েছেন কিংবদন্তীতুল্য সাংবাদিক কামাল লোহানী। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের সময় থেকে অসংখ্যবার বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্যে এসেছেন। ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিন রেডিও কমেন্টি করেছেন তিনি। কলকাতা সংবর্ধনা সভায়ও তিনি কমেন্টি করেছেন। সংবাদ সংগ্রহের কাজে বঙ্গবন্ধুকে অনুসরন করেছেন ছায়ার মত। দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় তিনি বঙ্গবন্ধুকে কীভাবে ভাবছেন তা জানতে একুশে টেলিভিশন অনলাইন মুখোমুখি হয় তাঁর। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন একুশে টেলিভিশন অনলাইন প্রতিবেদক আলী আদনান।

একুশে টেলিভিশন অনলাইন: বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আপনার প্রথম পরিচয় কীভাবে?

কামাল লোহানী: ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে আমি কর্মী ছিলাম। তখন বঙ্গবন্ধু পাবনায় নির্বাচনী প্রচারে যেতেন ও আমাকে কর্মী হিসেবে চিনতেন। তবে সরাসরি সান্নিধ্যে আসি ১৯৬২ সালে। এ বছর আমি গ্রেফতার হয়ে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে যাই। আমাকে পাঠানো হয় ২৬ নাম্বার সেলে। সেই সেলে বঙ্গবন্ধু ছিলেন। সেলে ঢুকতেই একটি দরাজ কন্ঠ বলে উঠল, `আয় আয় এখন থেকে আমাদের সঙ্গে বাস করতে হবে।` এ দরাজ কন্ঠটিই বঙ্গবন্ধু। আমার ওই বয়সে জেল খানায় হঠাৎ করে জেল খানায় গিয়ে এমন আন্তরিক সান্নিধ্য আমার মনোবল বাড়িয়ে দেয়। এরপর সাড়ে তিন মাস আমরা একসঙ্গে ছিলাম। বঙ্গবন্ধুর প্রতিটা কথা আমার জন্য যেমন শিক্ষণীয়, প্রতিটা আচরণ ছিল আমার জন্য বিস্ময়কর।

একুশে টেলিভিশন অনলাইন: জেলখানায় তখন বোধহয় অনেক নেতা ছিলেন।

কামাল লোহানী: হ্যাঁ, বঙ্গবন্ধু সহ অনেক নেতা তখন কারাগারে। জেলখানায় দীর্ঘদিন ধরে বন্দী ছিলেন রণেশ দাস গুপ্ত। বামপন্থী নেতা। বঙ্গবন্ধু তাঁকে যে কী পরিমাণ শ্রদ্ধা করতেন তা না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। জেলখানায় এমন অনেক পুরনো কারাবন্দী ছিল যারা পনের বিশ বছর ধরে জেল খাটছিল। আমি খেয়াল করে দেখলাম, জেলখানায় নেতৃত্ব বা প্রভাব খাটানোর কোন ইচ্ছা বঙ্গবন্ধুর ছিল না। সবাইকে সহবন্দী হিসেবে ট্রিট করতেন। আমাদের একই সেলে তাজউদ্দিন ছিলেন, আবুল মনসুর আহমেদ (ডেইলী স্টার সম্পাদক মাহফুয আনাম এর বাবা) ছিলেন, কফিল উদ্দিন চৌধুরী ছিলেন, ইত্তেফাক- এর তোফাজ্জেল হোসেন মানিক মিয়া ছিলেন, কোরবান আলী ছিলেন। ছাত্রনেতাদের মধ্যে শাহ মোয়াজ্জেম, শেখ ফজলুল হক মণি, হায়দার আকবর খান রনো, শ্রমিক নেতাদের মধ্যে নাসিম আলী ছিলেন। আমাদের মধ্যে রাজনৈতিক মতানৈক্য ছিল। কিন্তু আমরা সবাই একটা বিষয়ে একমত ছিলাম। তা হলো আমাদের শত্রু এক।

একুশে টেলিভিশন অনলাইন: তখন বঙ্গবন্ধুর প্রভাব আপনার উপর কেমন পড়েছিল?

কামাল লোহানী: বঙ্গবন্ধুকে আমি `লিডার` সম্বোধন করতাম। বঙ্গবন্ধু বললেন, তুই আমাকে লিডার ডাকবি না। আমি জানি তোর লিডার কে। কারণ, তিনি জানতেন, রাজনৈতিক মতাদর্শের দিক থেকে আমি তাঁর অনুসারী নই। আমি গোঁ ধরে তাঁকে লিডার ডেকেছি সব সময়। আমরা বিকেলে ভলিভল খেলতাম। আপনারা জানেন, বঙ্গবন্ধু টুঙ্গীপাড়ায় ভাল ফুটবল খেলতেন। কিন্তু কারাগারে দেখেছি তিনি ভাল ভলিবলও খেলেন। তাঁর শারীরিক উচ্চতার কারণেই তিনি ভাল খেলতেন। আমরা দুটো দলে ভাগ হয়ে খেলতাম। একটা দলে ক্যাপ্টেন ছিলাম আমি। বঙ্গবন্ধু আমাকে ক্যাপ্টেন বানিয়ে তিনি আমার দলে খেলতেন। খেলার মাঠে তিনি খেলোয়াড়। অন্য কিছু তখন তার মাথায় আসতো না। একে একে সবাই জামিন নিয়ে বের হয়ে গেল। শুধু বঙ্গবন্ধু, আমি ও রনেশ দা রয়ে গেলাম। আমার রিলিজ অর্ডার যখন আসল, তিনি তখন বললেন, তুইও চলে যাবি? আমি তখন তাঁকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলি। কারাগারে একটা জিনিস খেয়াল করেছি। সেটা হলো জেলার থেকে শুরু করে বাইরের সবাই বঙ্গবন্ধুর প্রতি একটা গোপন আনুগত্য দেখায়। গোপন একটা শ্রদ্ধা সবাই লালন করে।

একুশে টেলিভিশন অনলাইন: আপনি যখন বঙ্গবার্তায় কাজ করতেন তখন বঙ্গবন্ধুর ছবি ছাপাতেন না। সত্যি নাকি?

কামাল লোহানী: হ্যাঁ সত্যি। তবে একবার ছেপেছিলাম। খুব বড় করেই ছেপেছিলাম। ওনাে বক্তৃতাটা হুবুহু ওনার ভাষায় তুলে দিয়েছিলাম। ওনি ফোন করলেন অফিসে। আমি রিসিভ করার পর বললেন, ` কীরে? তোরা তো আমার ছবি ছাপিস না? আজ ছাপলি যে?` আমি ভ্যাবাচ্যকা খেয়ে গেলাম। কী বলব ভাবছি। তিনি বললেন, `ফজা ( সম্পাদক ফয়েজ আহমেদ) কৈ?` আমি বললাম, প্রেসক্লাবে। তিনি হো হো করে হেসে বললেন, `তাস খেলতে গেছে। না? বলিস আমি ফোন করছিলাম`। এই হচ্ছে বঙ্গবন্ধু। যিনি সবকিছু সহজ স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারতেন।

একুশে টেলিভিশন অনলাইন: বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধের পরে যখন কলকাতায় সংবর্ধনা নিতে গেলেন তখন কমেন্টি আপনি করেছিলেন। সেখানে বিশেষ কোন স্মৃতি?

কামাল লোহানী: হ্যাঁ। বঙ্গবন্ধু পড়াশুনা করেছেন কলকাতা ইসলামীয়া কলেজে। ছাত্ররাজনীতি করেছেন কলকাতায়। সেখানে তাঁর অনেক স্মৃতি। বক্তৃতা শেষ করে আমাকে বললেন, ` ওই আমি ছাগু মিয়ার হোটেলে চা খেতে যাব`। আমি বললাম, ` আপনি তো এখন ইসলামীয়া কলেজের ছাত্র না। একটা দেশের প্রধানমন্ত্রী। আপনার নিরাপত্তা নিয়ে আয়োজকরা চিন্তিত। তারা আপনাকে যেতে দেবে না। তিনি অনেকটা আদরের সঙ্গে ধমক দিয়ে বললেন, `ধূর, শেখ মুজিবের আবার নিরাপত্তা কী`।

একুশে টেলিভিশন অনলাইন: ১৫ আগস্ট নিয়ে বলুন।

কামাল লোহানী: ১৫ আগস্ট সকালে আমাকে টেলিফোন করে আমার সহকর্মী খুরশীদ আলম। এরপর রেডিও খুলে মেজর ডালিমের কণ্ঠ শুনি। ` শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে।` এরপর অফিসে গেলাম। কিন্তু অফিসে আমাদের কিছুই করার ছিলনা। এরপর সংবিধান বাতিল হল। পার্লামেন্ট ভেঙ্গে দেওয়া হলো। সরকারের ভেতরে যারা ভিন্ন মত পোষণ করত তারা মোশতাকের সাথে হাত মিলিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় তারা পাকিস্তানের সঙ্গে কনফেডারেশন করার ব্যাপারে সক্রিয় ছিল। যদিও তাজউদ্দিন তা হতে দেয়নি।

একুশে টেলিভিশন অনলাইন: সাধারন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেটিই একদিন জাতির জনক হলেন। বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র- এই যে একটা পূর্ণাঙ্গ কনসেপ্ট তা ওই সময়ের প্রেক্ষাপটে তিনি কীভাবে ধারন করলেন?

কামাল লোহানী: তখন যারা রাজনীতি করত তাদের জেলখানায় যাওয়াটা স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল। বঙ্গবন্ধু এ ব্যাপারে এগিয়ে ছিলেন। সেখানে অনেক পুরনো বামনেতাদের সান্নিধ্য তিনি পেয়েছেন। তাদের প্রভাব পড়াটা স্বাভাবিক। তাছাড়া তখন সবাই রাজনীতির পাশাপাশি পড়াশুনা করতেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি, দর্শন - এগুলো রাজনৈতিক কর্মীদের মনে মগজে গেঁথে থাকত। ফলে শোষিত বঞ্চিত মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে বঙ্গবন্ধু দর্শনের জায়গা থেকে তাঁর অাসল পরিচয় পেয়েছিলেন। ৪৭- এর অাগে তিনি যখন পাকিস্তান অান্দোলন করেছেন তখন তিনি মুসলিম লীগের প্রগতিশীল ধারায় ( আবুল হাশিম গ্রুপ) ছিলেন।

একুশে টেলিভিশন অনলাইন: বঙ্গবন্ধু হত্যার রাজনীতি কী আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের ফল?

কামাল লোহানী: যেটা বলেছেন সেটা খুবই জটিল প্রশ্ন। কারণ, বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকবেন এই অবস্থা ছিল না। চারদিক থেকে চক্রান্ত হচ্ছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন সপ্তম নৌ বহর পাঠিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে শেষ করতে চেয়েছিল। রাশিয়া সাপোর্ট না করলে আমাদের অবস্থা কঠিন হতো। যখন মার্কিনীরা দেখল সপ্তম নৌ বহরের পরিকল্পনা ব্যর্থ তখন তারা পাকিস্তানের সঙ্গে কনফেডারেশন করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। সেই পরিকল্পনায় অন্যতম এজেন্ট ছিল খন্দকার মোশতাক। অস্বীকার করার উপায় নেই এই পরিকল্পনাগুলোর শেষ পরিণতি ১৫ আগস্ট। অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু হত্যা মার্কিন ষড়যন্ত্রের ফল।

একুশে টেলিভিশন অনলাইন: আপনাকে ধন্যবাদ। ইতিহাসে অনেক নতুনত্বের সন্ধান অাপনি অামাদের দিয়েছেন।

কামাল লোহানী: আপনাকেও ধন্যবাদ।

আআ/ এআর

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি