ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, || আশ্বিন ২ ১৪২৬

Ekushey Television Ltd.

মমতাময়ী রোকেয়া কি হেরে যাবেন?

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ১৮:১৪ ১৮ এপ্রিল ২০১৮ | আপডেট: ১৯:১৭ ১৮ এপ্রিল ২০১৮

কারওয়ান বাজার কাঁচাবাজারের কাছে ফুটপাতে বসে দূরে তাকিয়ে আছেন এক বৃদ্ধা নারী। নাম বেগম রোকেয়া। বয়স ষাটের বেশি, জীর্ণ-শীর্ণ শরীর। কখনো কারওয়ান বাজারের ফুটপাতে, কখনো রাস্তার মোড়ে আবার কখনো বিভিন্ন অফিসের পাশে- খোলা আকাশের নিচে কাটে তাঁর দিন। সঙ্গী বলতে একটা ছোট ভিক্ষার থালা, আর এক পুটলি। গ্রীস্মের কাকফাটা রোদ কিংবা বৈশাখী ঝড়-বৃষ্টি সবই যেন পরাজিত জীবনযুদ্ধে লড়াকু এ নারীর কাছে।

কথা বলে জানা গেছে, প্রতিদিন কারওয়ান বাজারের বিভিন্ন জায়গায় ভিক্ষা করে ৬০ থেকে ৭০ টাকা আয় করেন তিনি। একটা সিঙ্গারা, পুরি আর এক গ্লাস পানি খেয়ে কাটিয়ে দেন দিন-রাত। আবার কখনো অফিসগামী লোকজনের দেওয়া উচ্ছিষ্ট খাবার খেয়ে পেট পুরেন তিনি। তবে টাকা আয় করলেও, বুদ্ধিপ্রতিবন্দ্বী অসুস্থ ছেলে, ছেলের বউ আর নাতনীর উপোস মুখগুলো চোখের সামনে ভেসে ওঠায় কোনোরকমে পেটে পাথর বেঁধে দিন কাটিয়ে দেন মমতাময়ী এ মা।

তাদের মুখের খাবার যোগাতে সাত বছর আগে তিনি ঢাকায় আসেন। মমতাময়ী রোকেয়া জানান, অসুস্থ তাঁর ছেলে। থাকেন গ্রামের বাড়িতে। তাঁর পাঠানো টাকার উপর উম্মুখ হয়ে চেয়ে থাকে পরিবারের বাকি তিন সদস্য। অভাবের সংসারে ছেলের বোঝা হয়ে থাকতে চাননি তিনি, তাই ঘর ছেড়ে রাস্তায় নেমেছে অভাবের তাড়নায়। শুধু দু’বেলা দু মুঠো খাবারের অভাবে আর ছেলের মঙ্গল কামনায় তিনি আজ রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ভিক্ষা করছেন। ছেলের জন্য প্রাথনায় তাঁর অষ্ট প্রহর কাটে। ছেলের কথা বলতে বলতেই চোখের পাতা ভিজে যায় এ নারীর।

তাঁর নাড়িছেঁড়া ধন আমিরের অসুস্থতা তাঁকে সারাক্ষণ বেদনায় আচ্ছন্ন করে রাখে। যে বয়সে মায়েরা সন্তানের আয়ের টাকায় দিনানিপাত করে থাকেন, সে বয়সে উল্টো তাঁকে ছেলেকে টাকা পাঠাতে হচ্ছে। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে পায়ে হেঁটে ভিক্ষে পাওয়া অর্থ দিয়ে সন্তানের মুখের খাবার আর ওষুধ যোগাতে হচ্ছে। যশোরে থাকা অবস্থায় অন্যের বাড়িতে কাজ করতেন রোকেয়া। কিন্তু জরায়ুতে টিউমার অপারেশন হওয়ার পর আর ভারী কাজ করতে পারেননা তিনি।

বেগম রোকেয়া ভাগ্য বিড়ম্বিত এক অসহায় নারী। এই রোকেয়া সমাজের অসহায় নিরন্ন নারীদের একজন। খুলনার সুন্দরবনের কয়রা গ্রামে তাঁর জন্ম। আনুমানিক বয়স ষাটের কিছু বেশি। তবে ঘটনাবহুল একাত্তর সালের স্মৃতি তাঁর মনে এখনও চিরজাগরুক । মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর পরিবার খুলনা থেকে যশোরের ঝিকরগাছা উপেজলায় চলে আসে।

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকবাহিনী ও তাদের দোসররা যখন হত্যাকাণ্ড,অগ্নি-সংযোগ নারী ধর্ষণ শুরু করে কয়রা গ্রামের অধিকাংশ মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে আশ্রয়ে চলে যায়। সে সময় পাকবাহিনী পাখির মত মানুষকে গুলি করে হত্যা করে। শত্রুর হাত থেকে পালাতে গিয়ে ৩ ভাই ও এক বোনকে যশোরের বেনাপোলের কাছে হারিয়ে ফেলেন তিনি।

সীমান্ত পার হওয়ার সময় মুক্তিবাহিনীর সাথে পাকবাহিনীর সম্যক যুদ্ধবাঁধে । পাকবাহিনীর আক্রমণের হাত থেকে বাঁচতে একেক জন একেক দিকে চলে যায়। ওই দিন তাঁর বাবা মাকে খুঁজে পেলেও ফিরে পাননি পরিবারের বাকি চার সদস্যকে। যুদ্ধদিনের কথা বলতেই বেগম রোকেয়া আবেগ প্রবণ হয়ে পরেন।

তিনি বলেন, ‘‘রেজাকাররা ঘরে ঘরে বউ ঝিদের বেইজ্জতি করছে, লুটপাট করছে, আমাগো গ্রামেও করছে। চারদিকে আগুন লাগাইয়া দিছে, যুদ্ধের সময় আমি তখন সেয়ানা হইছি। ভয়ে ঘরবাড়ি ছাইড়া বাগানে পলাইছি। মুসলমান বাড়িতে চাইয়া চাইয়া খাইছি।’
রেজাকাররা হিন্দুদের ভাতের প্লেটে মাটিতে ফেলাইয়া দিত। হিন্দুমেয়েদের অত্যাচার করতো। সেই সব কথা আমার এহেনও মনে পরলে ডর লাগে। পাঞ্জাবিদের ভয়ে ইজ্জত বাঁচাইতে আমার বাপে আমাগোরে লুকায় রাখছিল। কিন্তু পলাইতে যাইয়া আমার ভাইবোন হারাই গেছে, এহেন পাই নাই; ওরা কোথায় আছে, কেমন আছে জানি না। মরবার আগে একবার দেখবার চাই’’

যুদ্ধের পরই যশোরের ঝিকরগাছার কাশেম মোল্লার সঙ্গে রোকেয়ার বিয়ে হয়। রোকেয়ার স্বামী স্থানীয় একটি আটার মিলে দিন মজুরি করে সংসার চালাত । রোকেয়া ও কাশেমের সংসারে অভাব থাকলেও সুখের অভাব ছিল না তাদের জীবনে। বিয়ের এক বছর পরে তাদের ঘর আলো করে এলো এক পুত্র সন্তান। জন্ম থেকেই সেই সন্তান বুদ্ধি প্রতিবন্ধি। এর পর থেকে সন্তানকে নিয়ে শুরু হয় তাঁর আরেক সংগ্রামের জীবন। অন্যের বাড়িতে কাজ করে সে পরিবারের বাড়তি উপার্জনে সহযোগিতা করতো। সতের বছর আগে রোকেয়ার স্বামী মারা যায়। একমাত্র সন্তানের অসুস্থতা নিয়ে তাঁর দুর্ভোগ পৌঁছায় চরমে। জীবন সংগ্রামে নেমে আসে অমোঘ বাস্তবতা।

রোকেয়ার দিনে দিনে বয়স আরও বাড়ছে। শরীরে রোগজীবাণু বাসা বাঁধছে। কতদিন এভাবে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ভিক্ষা করে সন্তান ও নিজের জীবন চালাতে পারবেন তা নিয়ে মারাত্মক শঙ্কায় আছেন ষাটোর্ধা এ নারী। তাঁর প্রশ্ন, ‘আমার মৃত্যু হলে, কে দেখবে আমার সন্তান ও নাতনীকে। কেউ কি নেই, আমাদের এ দুঃখের জীবনে একটু আলোক শিখা জ্বালানোর’?

এমজে/

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি