ঢাকা, রবিবার   ১৯ জানুয়ারি ২০২০, || মাঘ ৬ ১৪২৬

Ekushey Television Ltd.

মাকে ছুঁতে দিল না কাঁটাতারের বেড়া 

ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি

প্রকাশিত : ২১:২৬ ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯ | আপডেট: ২১:২৬ ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯

‘মা, ও মা, তোমাকে যে খুব ছুঁতে ইচ্ছে করছে, একটু এ পাশে আসো না’-মেয়ের এমন আকুতি শুনে মায়ের মনটিও কাঁদছিল, তবে বাদ সাধে সীমান্তে মা-মেয়ের মাঝে থাকা কাঁটাতারের বেড়া। মা-মেয়ে কেউ কাউকে ছুঁয়ে দেখতে পারছেন না। কারণ মা-মেয়ের মাঝখানে রয়েছে প্রায় ১০ ফুটের দূরত্বের কাঁটাতারের বেড়া।

ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল কোচল ও হরিপুর উপজেলার চাপসা সীমান্তে শুক্রবার ভারত ও বাংলাদেশের মানুষের মিলন মেলায় মা-মেয়ের ছুঁয়ে দেখতে না পারার হৃদয়বিদারক ঘটনা দেখা যায়। মেয়ে শান্তি রানী পঞ্চগড় জেলার আটোয়ারী উপজেলায় আর মা ভারতের আসামে থাকেন। মেয়ের বাংলাদেশে বিয়ে দিয়েছেন প্রায় ১৮ বছর।
 
মা-মেয়ের দেখা প্রায় এই সময় হয়ে থাকে। তবে সেটা দেখা হয়, আর খোঁজখবর নেওয়া হয় মাত্র, কিন্তু মা-মেয়ের একসঙ্গে হওয়ার সুযোগ হয় না। 

প্রতিবছর পাথরকালীর মেলা বিজিবি ও বিএসএফের সম্মতিতে এই সাক্ষাতের সুযোগ সৃষ্টি হয়। সাক্ষাতে দুই পারের আত্মীয়স্বজনদের কাঁটাতারের বেড়া তাদের আলাদা করে রাখলেও আবেগ পৌঁছে যায় সীমান্ত পেরিয়ে। 

জানা যায়, বাংলাদেশের ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, দিনাজপুর, রংপুর এবং ভারতের কোচবিহার, আসাম, দার্জিলিং, শিলিগুড়ি, জলপাইগুড়ি, কলকাতাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে বাইসাইকেল, অটোরিকশা, মাইক্রোবাস, মিনিবাসযোগে মেলাস্থলে আসেন লাখো মানুষ।
 
স্থানীয়রা জানান, ভোর থেকে দুই দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ সীমান্তে আসেন। দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন থাকার ফলে একে অপরের সঙ্গে মিলিত হওয়ার এ সুযোগ হাতছাড়া করতে চান না কেউ। প্রতিবছর দুই দেশের স্বজনদের এ মিলন মেলা এখানে জন্ম দেয় এক বিরল দৃশ্যের। হাজার হাজার মানুষ কথা বলেছেন এদিন তাদের স্বজনদের সঙ্গে। দুই দেশের বিভিন্ন স্থানে থাকা সাধারণ মানুষ যারা অর্থের অভাবে পাসপোর্ট-ভিসা করতে পারেন না, তারা এই দিনটির অপেক্ষায় থাকেন। সারা বছর দুই দেশের মানুষ অপেক্ষা করেন এই দিনটির জন্য। মুঠোফোনের মাধ্যমে আগে থেকেই জানিয়ে দেন স্বজনরা কে কোথায় দেখা করবেন। ভারতীয় অধিবাসীরা কাঁটাতারের পাশে এলে সেখানে বাংলাদেশেরও লাখো নারী-পুরুষ সমবেত হন। 

অমৃতা ঘোষ ভারতীয় সীমান্তে ও শাশুড়ি শর্মিলা ঘোষ বাংলাদেশ সীমান্তে। নাতি-নাতনি সবাই সবার সঙ্গে কথা বলছে কান্নাজড়িত কণ্ঠে। শর্মিলা ঘোষ বলেন, ৮ বছর পর জামাই ও মেয়ের দেখা পেলাম। একে অপরকে জড়িয়ে ধরার ইচ্ছা থাকলেও পারছি না। বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে মাঝখানে কাঁটাতারের বেড়া। ইচ্ছে হচ্ছিল একটু ছুঁয়ে দেখার, কিন্তু ছুঁতে পারিনি। জড়িয়ে একটু চিৎকার করে কান্না করি, তবে হয়তো দীর্ঘদিনের জমে থাকা কষ্টগুলো থেকে একটু রেহাই পেতাম-বলছিলেন ভারতের মাকড় হাটে থাকা ছোট খালা জোসনাকে দেখতে আসা ফুলবাড়ীর রফিকুল ইসলাম। 

রানীশংকৈল উপজেলার উত্তর লেহেম্বা থেকে মেয়েরে সাথে দেখা এসেছেন নগেন ও তার স্ত্রী। তার মেয়ে ভারতের নকশাল বাড়িতে থাকেন। তিনি জানান,দীর্ঘদিন তাদের সাথে দেখা না হওয়ায় এবারে তাদেরকে দেখতে মিলন মেলায় হাজির হয়েছি। অনেক খোঁজাখুঁজি করে তাদের সাথে দেখা ও কথা হয়েছে। 
 
মেলা কমিটির সভাপতি নগেন কুমার পাল জানান, প্রতিবছর দুই দেশের মিলন মেলার জন্যই পাথরকালী মেলার আয়োজন করা হয়। দেশ বিভাগের পূর্বে এ এলাকা ছিল ভারতবর্ষের আওতায়।পরবর্তীতে দেশ দেশ ভাগ হলে এখানে বসবাসরত বাসিন্দাদের অনেকে ভারতে পরে যায়।আর পাথরকালী পূজা অনুষ্ঠিত হয় প্রতিবছর ডিসেম্বরের ১ম শুক্রবার।এই একটি দিনে আত্বীয় স্বজনদের দেখার জন্য এ এলাকার বাসিন্দারা বছরজুড়ে  অপেক্ষা করে থাকে।

কেআই/আরকে                                
 

© ২০২০ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি