জামায়াতের ইফতার মঞ্চে তালিকাভুক্ত মাদক কারবারি, ছবি ভাইরাল
প্রকাশিত : ০৯:৪১, ১১ মার্চ ২০২৬
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত মাদক কারবারি সেতাফুর রহমান বাবুকে রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে জামায়াতে ইসলামীর একটি ইফতার মাহফিলের মঞ্চে দেখা গেছে। যার একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।
বাবু আগে ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য ছিলেন। হেরোইনসহ গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যাওয়ায় পরে তাকে ওই পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সেতাফুর রহমান বাবু যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তিনি মাটিকাটা ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সহসভাপতি। গণ-অভ্যুত্থানের পর তাঁর বিরুদ্ধে হত্যাসহ একাধিক মামলা হয় এবং তিনি পলাতক ছিলেন।
তবে সম্প্রতি হঠাৎ তাকে এলাকায় দেখা যায় এবং গত সোমবার (৯ মার্চ) গোদাগাড়ী উপজেলার মাটিকাটা আদর্শ কলেজ মাঠে অনুষ্ঠিত জামায়াতে ইসলামীর ইফতার মাহফিলের মঞ্চে উপস্থিত থাকতে দেখা যায়।
ইফতার মাহফিলে প্রধান অতিথি ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির ও রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক মুজিবুর রহমান। মঞ্চে তাঁর ঠিক পেছনের সারিতে সেতাফুর রহমান বাবুকে বসে থাকতে দেখা যায়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গোদাগাড়ী উপজেলার রেলগেট এলাকায় সেতাফুর রহমান বাবুর বাড়ি। একসময় তিনি পাওয়ার টিলারের শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। পরে হেরোইনের কারবারে জড়িয়ে বিপুল অর্থসম্পদের মালিক হন। পরবর্তীতে তিনি মাটিকাটা ইউনিয়ন পরিষদের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য নির্বাচিত হন।
২০১৮ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক অধিশাখা-২ থেকে প্রণীত মাদক কারবারিদের একটি তালিকায় ৯ নম্বরে সেতাফুর রহমান বাবুর নাম আসে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজশাহীতে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের একশ্রেণির অসাধু রাজনীতিক ফেনসিডিল, হেরোইন ও ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকের কারবারে জড়িত। এসব মাদক ব্যবসা এলাকায় নতুন মাদকসেবী তৈরি করছে এবং অর্থের যোগান দিতে গিয়ে অনেকেই ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও খুনসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন।
সেতাফুর রহমান বাবুর বিরুদ্ধে একাধিক মাদক মামলা রয়েছে। এছাড়াও ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন মাটিকাটা এলাকায় একটি ভোটকেন্দ্র দখলকে কেন্দ্র করে বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। ওই ঘটনায় জেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক রবিউল ইসলাম অরণ্য কুসুমের বাবা নজরুল ইসলাম নিহত হন।
গণ-অভ্যুত্থানের পর নিহত নজরুল ইসলামের বড় ছেলে মাসুম সরকার বাদী হয়ে সেতাফুর রহমান বাবুকে প্রধান আসামি করে একটি হত্যা মামলা করেন। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ওই এলাকায় জিয়া পরিষদের একটি কার্যালয় দখলের অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। গণ-অভ্যুত্থানের পর এ ঘটনাতেও তাঁর বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা হয়েছে।
মাটিকাটা ইউনিয়ন পরিষদের সচিব সাব্বির রহমান জানান, ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে ১০০ গ্রাম হেরোইনসহ গ্রেপ্তার হন ৮ নম্বর ওয়ার্ডের তৎকালীন ইউপি সদস্য সেতাফুর রহমান বাবু। এরপর তিনি কারাগারে থাকায় ইউপি কার্যালয়ে অনুপস্থিত থাকেন। বিষয়টি জেলা প্রশাসক স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে অবহিত করলে তাঁকে ইউপি সদস্য পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়। এরপর থেকেই তিনি বরখাস্ত অবস্থায় রয়েছেন।
নিহত নজরুল ইসলামের ছেলে ও জেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক রবিউল ইসলাম অরণ্য কুসুম বলেন, ‘‘শুনছি জামায়াতের ইফতার মাহফিল আয়োজনের অর্থ দিয়েছে সেতাফুর রহমান বাবু। তা না হলে তাকে মঞ্চে বসতে দিবে কেন?’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘আওয়ামী লীগের এই সন্ত্রাসী ভোটকেন্দ্র দখল করতে গিয়ে আমার বাবাকে হত্যা করেছে। সেই ব্যক্তিকেই এখন জামায়াতের মঞ্চে, একেবারে এমপির পাশে দেখা যাচ্ছে। এটা খুবই দুঃখজনক।’’
জামায়াতের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির ও রাজশাহী-১ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক মুজিবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি। তিনি গোদাগাড়ী উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ও জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি মো. কামরুজ্জামানের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
মো. কামরুজ্জামান বলেন, ‘‘সেতাফুর রহমান বাবু যে একজন মাদক কারবারি এবং যুবলীগের নেতা- এটি তিনি জানেন। তবে তিনি মঞ্চে বসেছিলেন, এ বিষয়টি পরে শুনেছি। তাঁকে অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। নেতৃবৃন্দ ইফতার মাহফিল নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। এর মধ্যে তাদের চোখ এড়িয়ে হয়তো বঞ্চে বসে পড়েছেন।’’
গোদাগাড়ী থানার ওসি হাসান বশির বলেন, সেতাফুর রহমান বাবুর নামে বর্তমানে কোনো মামলা বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আছে কি না, তা যাচাই করে বলতে হবে। তিনি বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, মাদক কারবারের সঙ্গে কেউ জড়িত থাকলে রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক না কেন, আইনগত ব্যবস্থা থেকে তার কোনো ছাড় নেই।
এএইচ
আরও পড়ুন










