ঢাকা, শুক্রবার   ২৮ জানুয়ারি ২০২২, || মাঘ ১৫ ১৪২৮

চাঁপাইনবাবগঞ্জে পদ্মার দুর্গম চরে যাচ্ছে বিদ্যুৎ 

ফারুক আহমেদ চৌধুরী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ 

প্রকাশিত : ২২:৫৪, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২১

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার পদ্মা নদীর দুর্গম চরে বিদ্যুতায়নের কাজ এগিয়ে চলছে। বিচ্ছিন্ন এ চরাঞ্চলে সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদান করা হবে। পদ্মার চর অধ্যুষিত নারায়ণপুর ইউনিয়নের কয়েক হাজার মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আসছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ নদীবেষ্টিত চরঞ্চলবাসীর জীবনধারা পরিবর্তনের পাশাপাশি কৃষি ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে বলে প্রত্যাশা করছেন চরবাসীসহ সংশ্লিষ্টরা। সর্বনাশা পদ্মা নদীর ভাঙাগড়ার খেলায় মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন এই ইউনিয়নটি এতদিন বিদ্যুৎ সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিল।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির প্রকৌশলীরা বলেছেন, আগামী এপ্রিলেই পদ্মার দুর্গম চরে জ্বলবে বিদ্যুতের আলো। সে লক্ষেই দ্রুত গতিতে কাজ এগিয়ে চলছে। বিদ্যুৎ সরবরাহের ফলে চরাঞ্চলের কৃষি ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। বিশেষ করে এখানে আগে যে পরিমাণ ফসল উৎপাদন হতো, বিদ্যুতের কারণে এখন বেশি পরিমাণে বিভিন্ন ধরনের ফসল উৎপাদন হবে। ডিজেলনির্ভর এই অঞ্চলের কৃষকরা এখন বিদ্যুতের সাহায্যে জমিতে সেচ দিয়ে একাধিক ফসল ফলাতে পারবে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বহু বছর আগে পদ্মার চরে জনবসতি গড়ে ওঠে। তবে চরের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিলেও বিদ্যুৎ না থাকায় সেখানকার মানুষ অনগ্রসরই থেকে যাচ্ছে। একই সঙ্গে বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষ আয়ের বহুমুখী ধারার সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ত করতে পারছে না। ওই চরে চারদিক থেকে পানিবেষ্টিত হওয়ায়ে এখানে সরাসারি গ্রিড পৌঁছানো কঠিন। সঙ্গত কারণে ওই এলাকায় সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপন করা হচ্ছে।

জানা গেছে, পদ্মার চরে বসবাস করা মানুষগুলোর কাছে বিদ্যুৎ স্বপ্নের মতো। তারা কখনো ভাবেনি এ দুর্গম জনপদে বিদ্যুৎ আসবে। তাদের স্বপ্ন এবার হাতের মুঠোয় ধরা দিচ্ছে। দুর্গম চরাঞ্চলে বিদ্যুতায়নের দৃশ্যমান কর্মকাণ্ডে আনন্দ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। তারা মনে করছেনÑ এর মাধ্যমে দীর্ঘদিনের অন্ধকারের অভিশাপ থেকে মুক্ত হয়ে আলোর পথে নতুন যাত্রা শুরু করবে তারা। একইসঙ্গে জীবনমানে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে তাদের। অবহেলিত এ জনপদে যোগ হবে নতুন দিগন্তের সূচনা। পদ্মার চরের মানুষের সৌরবিদ্যুৎ, হারিকেন ও প্রদীপের আলো একমাত্র ভরসা। ডিজেলচালিত মেশিনে উৎপাদিত হচ্ছে কৃষিপণ্য। এবার পদ্মা নদীর তলদেশ দিয়ে সেই চরে বিদ্যুতায়নের কাজ চলছে। সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আনা হচ্ছে এসব সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, পদ্মানদী এ চরকে মূল ভূখণ্ড থেকে আলাদা করেছে। এর এক পাশে ভারতীয় সীমানা। নৌযান ছাড়া চরে যাতায়াতের ব্যবস্থা নেই। আমরা চরবাসী কখনো বিদ্যুতের আলো পাব, তা কল্পনাও করিনি। আজ আমাদের চরে বিদ্যুতের পিলার, বিদ্যুতের তার টানাসহ সব কাজ শেষ পর্যায়ে। আমরা খুবই আনন্দিত।

স্থানীয় এক কৃষক বলেন, এখানে বিদ্যুৎ আসবে, তা আমাদের জন্য ছিল স্বপ্নের মতোই। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের ফলে আমরা এলাকার কৃষকরা অনেক উপকৃত হবো। বিশেষ করে ডিজেলচালিত ইঞ্জিনের সাহায্যে জমির সেচ কাজ করতে গিয়ে আমাদের অনেক টাকা খরচ হতো। এখন বিদ্যুৎ সুবিধা পাওয়ায় আমাদের জমি চাষাবাদ করতে টাকা খরচ কম হবে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি কৌশিক আহম্মেদ বলেন, দুর্গম চরে বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদান শেখ হাসিনার সরকারের যুগান্তকারী একটি উদ্যোগ। এতে পিছিয়েপড়া এ জনপদ বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত হবে। মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন হবে। আর্থসামাজিক অবস্থারও পরিবর্তন ঘটবে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির সহকারী জেনারেল ম্যানেজার (ওএন্ডএম) মো. মেহেদী হাসান বলেন, সাবমেরিন কেবলের মাধ্যমে স্থলভাগের মতোই বিদ্যুৎ সুবিধা পাবেন নদীবেষ্টিত এই অঞ্চলের লোকজন। বিদ্যুৎ সরবরাহ নদীবেষ্টিত চরাঞ্চলবাসীর জীবনধারা পরিবর্তনের পাশাপাশি কৃষি ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। গড়ে উঠবে শিল্প-কলকারখানাসহ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। এতে কৃষকরা অনেক লাভবান হবে। ধান, গম, রবিশস্যসহ সব ধরনের ফসলের চাষাবাদ, মৎস্য চাষ, পোল্ট্রি ফার্মসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই এলাকার লোকজন সুবিধা পাবে।

এ প্রসঙ্গে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার রফিকুল ইসলাম জানান, পদ্মানদীর তলদেশে সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে চরাঞ্চলকে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের আওতায় আনা হচ্ছে। সদর উপজেলার ইসলামপুরের চাটাইডুবী বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র থেকে সাড়ে ১৪ কিলোমিটার সাবমেরিন ক্যাবল ও ১০৭ কিলোমিটার সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে পদ্মার চরে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে। এর মধ্যে ১০৭ কিলোমিটার সঞ্চালন লাইন সম্পন্ন হয়েছে। এতে নারায়ণপুর ইউনিয়নের সাড়ে ৭ হাজার গ্রাহক বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আসবে। সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপনের ফলে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় কৃষিপণ্য উৎপাদন বাড়বে। সমৃদ্ধ হবে গ্রামীণ অর্থনীতি।

তিনি বলেন, আগামি এপ্রিল মাসের মধ্যেই চরাঞ্চল বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত হবে। দ্রুত সময়ের মধ্যেই পুরো চরের ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে যাবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

আরকে//


Ekushey Television Ltd.

© ২০২২ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি