নোয়াখালীতে সেতু নির্মাণে রডের পরিবর্তে তার, প্রকৌশলীকে বদলি
প্রকাশিত : ১৬:১৬, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলায় সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন একটি সেতুর কাজে অনিয়ম ও নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্মাণকাজের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি আলোচনায় আসে। পরে ত্রুটিপূর্ণ কাজ ভেঙে নতুন করে করার নির্দেশ দেওয়া হয়। এ ঘটনায় উপজেলা প্রকৌশলীকে বদলি এবং উপসহকারী প্রকৌশলী ও ওয়ার্ক অ্যাসিস্ট্যান্টকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) ঘটনার তদন্তে এক সদস্যের কমিটি গঠন করে তিন কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। বিষয়টি জানিয়েছেন এলজিইডি নোয়াখালীর নির্বাহী প্রকৌশলী যুগল কৃষ্ণ মণ্ডল।
এলজিইডি নোয়াখালী কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বেগমগঞ্জ উপজেলার জমিদারহাট থেকে সাহেবেরহাট ও হাসানহাট হয়ে মাইজদী আঞ্চলিক মহাসড়কে ৪৯ দশমিক ০৬ মিটার দীর্ঘ আরসিসি ব্রিজটির নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর। শুরুতে মেসার্স হক ট্রেডার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠান কাজটি পায়। পরে কাজটি হাতবদল হয়ে ৫ কোটি ৬১ লাখ টাকা নতুন ব্যয়ে মো. ফরহাদ নামের এক ঠিকাদারের হাতে যায়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নির্মাণকাজের শুরু থেকেই সেতুটিতে নানা অনিয়ম দেখা যায়। এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে অভিযোগ দেওয়ার পর কিছু কাজ সংশোধন করা হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শেষের দিকে রাতে সেতুর ফুটপাতের স্ল্যাবে রডের পরিবর্তে তার ও নিম্নমানের সিমেন্ট ব্যবহার করে কাজ করা হয়। দিনের বেলায় পথচারীদের পা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব স্ল্যাব ভেঙে পড়ে। একই ধরনের অভিযোগ ওঠে সেতুর রেলিংয়ের কাজ নিয়েও।
স্থানীয় যুবক অনিক বলেন, সেতুটির কাজে শুরু থেকেই নানা অনিয়ম চলছে। এসব বিষয়ে তাঁরা একাধিকবার এলজিইডিতে মৌখিকভাবে অভিযোগ করেছেন। ঠিকাদারের লোকজনকে অনিয়ম দেখিয়ে দেওয়ার পরও রডের পরিবর্তে চিকন তার দিয়ে কাজ করার চেষ্টা করা হয়েছে।
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা মো. হাসান সোহেল বলেন, সেতুটির পাইলিংয়ের সময় থেকেই নানা অনিয়ম তাঁদের চোখে পড়ে। তাঁরা একাধিকবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তাঁর অভিযোগ, দিনের পরিবর্তে রাতে কাজ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, এই সেতু দিয়ে বেগমগঞ্জ, কবিরহাট ও সদর উপজেলার চার ইউনিয়নের হাজার হাজার মানুষ যাতায়াত করবেন। জেলা শহরের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য সেতুটি গুরুত্বপূর্ণ। নিম্নমানের কাজের কারণে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে এর দায় কে নেবে, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দারা সরকারি অর্থের অপচয় রোধ ও উন্নয়নকাজের গুণগত মান নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
এলজিইডি নোয়াখালীর নির্বাহী প্রকৌশলী যুগল কৃষ্ণ মণ্ডল বলেন, সোমবার সেতুটির নির্মাণকাজ সরেজমিনে পরিদর্শন করেন এলজিইডির সুপারিনটেন্ডিং ইঞ্জিনিয়ার, ল্যাবরেটরি টেকনিশিয়ান ও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের প্রতিনিধিরা। পরিদর্শনে সেতুর ফুটপাতের স্ল্যাবের কাজ নিম্নমানের এবং নকশা ও স্পেসিফিকেশন–বহির্ভূত বলে দেখা যায়। রেলিংয়ের রডের কাজও নিম্নমানের বলে প্রতীয়মান হয়।
তিনি বলেন, নিজে সরেজমিনে ফুটপাতের স্ল্যাবের নিম্নমানের কাজ দেখার পর ঠিকাদারের লোকজনকে সেগুলো দ্রুত ভেঙে অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হয়। মঙ্গলবার এলজিইডির লোকজনের উপস্থিতিতে স্ল্যাবগুলো ভেঙে ফেলা হচ্ছিল। এ সময় উৎসুক লোকজন ওই দৃশ্য মোবাইলে ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন।
নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, স্ল্যাব ও রেলিংয়ের যেসব জায়গায় নিম্নমানের কাজ হয়েছে, সেগুলো ভেঙে অপসারণ করা হয়েছে। জেলা, উপজেলা ও ঢাকা থেকে একাধিক দল বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তদারকি করছে।
এ ছাড়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স হক ট্রেডার্সকে দেওয়া চিঠিতে নকশা ও স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী ত্রুটিপূর্ণ কাজ সংশোধন করে সাত দিনের মধ্যে লিখিতভাবে জানাতে বলা হয়েছে। নকশা ও স্পেসিফিকেশন–বহির্ভূত কোনো কাজের বিল পরিশোধ করা হবে না বলেও জানানো হয়েছে।
মেসার্স হক ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ ফজলুল হক বলেন, কাজটি হক ট্রেডার্স পেলেও তাঁরা সরাসরি করছেন না। তাঁদের লাইসেন্সে সেনবাগের কয়েকজন মিলে কাজটি করছেন। তাঁদের মধ্যে একজনের নাম ফরহাদ।
ঠিকাদার মো. ফরহাদ বলেন, সেতুর কাজ শুরু থেকেই ভালোভাবে করা হচ্ছে। কয়েক দিন আগে তাঁর অজান্তে ফুটপাতের স্ল্যাব ও রেলিংয়ের কাজে কিছু ত্রুটি ধরা পড়ে। এরপর এলজিইডির প্রকৌশলীদের উপস্থিতিতে যেসব অংশের কাজ ভালো হয়নি, সেগুলো ভেঙে ফেলা হয়েছে। নির্দেশনা অনুযায়ী নতুন করে কাজ করে দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
এলজিইডি নোয়াখালীর নির্বাহী প্রকৌশলী যুগল কৃষ্ণ মণ্ডল বলেন, ঘটনায় বেগমগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী আবুল মনসুর আহমেদ ও উপসহকারী প্রকৌশলী মো. নাজমুল ইসলামকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। দায়িত্ব পালনে অবহেলার বিষয়ে পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে লিখিতভাবে জবাব দিতে বলা হয়েছে। অন্যথায় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ করা হবে।
তবে কারণ দর্শানোর নোটিশের আগেই তাঁকে বদলি করা হয়েছে বলে জানান বেগমগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী আবুল মনসুর আহমেদ। তিনি বলেন, দুই মাস আগে তিনি বেগমগঞ্জে যোগ দিয়েছেন। সেতুর কাজে অনিয়মের খবর পাওয়ার পর নিজে উপস্থিত থেকে নিম্নমানের কাজের অংশ ভেঙে অপসারণ করেছেন। বৃহস্পতিবার তিনি জানতে পারেন, তাঁকে রাঙামাটি জেলায় বদলি করা হয়েছে।
আবুল মনসুর আহমেদ জানান, উপসহকারী প্রকৌশলী মো. নাজমুল ইসলাম ও ওয়ার্ক অ্যাসিস্ট্যান্ট মো. মহিন উদ্দিনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
সেতুটির নির্মাণকাজে অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে এলজিইডি নোয়াখালী অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এ.এস.এম মহসীনকে প্রধান করে এক সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে তিন কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
এ.এস.এম মহসীন বলেন, তদন্ত কমিটির চিঠি পাওয়ার পর তিনি সরেজমিনে সেতুটি পরিদর্শন করেছেন। প্রাথমিকভাবে কাজে কিছু অনিয়ম ধরা পড়েছে। এসব বিষয়ে রোববারের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।
তবে উপজেলা প্রকৌশলী আবুল মনসুর আহমেদকে বদলি করা হয়েছে জানালেও কাউকে সাময়িক বরখাস্তের বিষয়টি তাঁর জানা নেই বলে জানান তিনি।
এমএইচ
আরও পড়ুন










