ঢাকা, বুধবার   ১৬ অক্টোবর ২০১৯, || কার্তিক ১ ১৪২৬

Ekushey Television Ltd.

কাদের হাত ধরে ঢাকায় ক্যাসিনোর বিস্তার?

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ১১:১৩ ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | আপডেট: ১১:১৭ ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নতুন মিশনে নেমেছেন। দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে তিনি অন্যায়, দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছেন। এই মিশনে ছাড় পাচ্ছেন না কেউ। নিজ দলের মধ্যেও যদি কোন অপরাধি থেকে থাকে তবে তাকেও ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। সরকারের এই নয়া মিশন ‘ক্যাসিনো’র (জুয়ার আস্তানা) বিরুদ্ধে। রাজধানীতে বিভিন্ন ধরণের অপরাধ, অপকর্ম ও সামাজিক অবক্ষয়ের পেছনে ‘ক্যাসিনো’ বিশেষ ভূমিকা রাখছে। তাই এটি যদি ধ্বংস করা যায় তবে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রেণে আসবে, আর এ জন্যই এই অভিযান। প্রশ্ন হচ্ছে- কোটি কোটি টাকার এই জুয়া খেলাটি দেশের মধ্যে কিভাবে প্রসার লাভ করলো? কাদের হাত ধরে এর উত্থান? 

অনেকেরই হয়তো অজানা ছিল- রিক্রিয়েশন সেন্টারের নামে সিঙ্গাপুর ও সিন সিটি লাসভেগাসের আদলে খোদ রাজধানীতে গড়ে তোলা হয় ক্যাসিনো (জুয়ার আস্তানা)। ঝকঝকে আলোকচ্ছটায় রমরমা এসব জুয়ার আড্ডায় প্রতিদিন উড়ত কোটি কোটি টাকা। ক্যাসিনোতে টাকা দ্বিগুণ করার প্রলোভনে পড়ে প্রতি রাতেই জুয়ার বোর্ডে সর্বস্ব হারিয়েছে মানুষ। আর কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে নেপালি জুয়াড়িচক্র।

ক্ষমতাসীন দলের কিছু নেতা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দুর্নীতিবাজ কিছু সদস্যের মদদে মূলত এ নেপালিরাই নিয়ন্ত্রণ করত ক্যাসিনো সাম্রাজ্য। বিদেশ থেকে প্রশিক্ষিত জুয়াড়ি এনে এই নেপালিরাই রাজধানীর বিভিন্ন ক্লাব ও রেস্টুরেন্ট ব্যবসার আড়ালে সাজিয়েছে পশ্চিমা ধাঁচের ক্যাসিনো ব্যবসা। যেখানে জুয়া ছাড়াও ইয়াবা-মদসহ বিভিন্ন মাদক সেবনের আখড়ায় পরিণত হয়।

ক্যাসিনো ক্লাবগুলোয় বিদেশি অবয়ব আনতে ক্যাসিনো পরিচালনার জন্য নেপাল, থাইল্যান্ডসহ চারটি দেশ থেকে উড়িয়ে আনা হয় প্রশিক্ষিত সুন্দরী নারীদের। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নেওয়া হতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তি। 

জানা গেছে, ১১ নেপালির হাত ধরে বাংলাদেশে ক্যাসিনোর বিস্তার লাভ করে। তারা হলেন- দিনেশ শর্মা, রাজকুমার, বিনোদ, দিনেশ কুমার, ছোট রাজকুমার, বল্লভ, বিজয়, সুরেশ বাটেল, কৃষ্ণা, জিতেন্দ্র ও নেপালি বাবা। রাজধানীতে যে কটি আধুনিক বৈদ্যুতিন ক্যাসিনো জুয়ার বোর্ড পরিচালিত হতো সেগুলোর বেশিরভাগই অপারেটিং সিস্টেম দেখভালের দায়িত্বে ছিলেন তারাই। চীন ও নেপাল থেকে মোটা বেতনে অভিজ্ঞ নারী-পুরুষ এনে এরাই সচল রাখেন ক্যাসিনোর চাকা। এ ১১ নেপালির কেউ কেউ ইতোমধ্যে ক্যাসিনোর মালিকও হয়েছেন।

ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা ক্যাসিনোর মধ্যে অন্যতম মতিঝিলের দিলকুশা ক্লাব ও মোহামেডান ক্লাব, গুলিস্তানের ওয়ান্ডারার্স ক্লাব ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্লাব, ফকিরাপুল ইয়ংমেনস ক্লাব, ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাব, নিউমার্কেট এলাকার অ্যাজাক্স ক্লাব, ধানমণ্ডির ধানমণ্ডি ক্লাব, কলাবাগান ক্লাব, গুলশান লিংক রোডের ফু-ওয়াং ক্লাব, মালিবাগের সৈনিক ক্লাব ও বনানীর গোল্ডেন ঢাকা বাংলাদেশ।

ইতিমধ্যে ইয়ংমেনস ক্লাব, ওয়ান্ডার্স ক্লাব, বনানীর গোল্ডেন ঢাকা বাংলাদেশ ও গুলিস্তানের মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্লাবে অভিযান চালিয়ে ১৮২ জন জুয়াড়ি ও ক্যাসিনোর সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের আটক করে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে। জব্দ করা হয়েছে ক্যাসিনোর উপকরণ ও মাদক। ক্লাবের আড়ালে আরও যেসব জায়গায় ক্যাসিনো আছে গা বাঁচাতে প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্যাসিনো বোর্ড আপাতত বন্ধ রেখেছে কর্তৃপক্ষ।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, মতিঝিলের দিলকুশা ক্লাব ও এলিফ্যান্ট রোডের এজাক্স ক্লাবের নিয়ন্ত্রক হলেন নেপালের বাসিন্দা রাজকুমার। মোহামেডান ক্লাব ও বনানীর আহম্মেদ টাওয়ারে অবস্থিত গোল্ডেন ঢাকা বাংলাদেশ নামে ক্যাসিনোর নিয়ন্ত্রক আবুল কাশেম এবং এমরান। গুলশানের ফুওয়াং ক্লাবের মালিক নুরুল ইসলাম ও টমাস বাবু; প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজার তুষার। মালিবাগের সৈনিক ক্লাবের নিয়ন্ত্রক সুরেশ বাটেল, জিতেন্দ্র জসিম ও এবিএম গোলাম কিবরিয়া।

গ্যাম্বলিংয়ের (জুয়া খেলা) জগতে ডন হিসেবেই পরিচিত দিনেশ নেপালের বাসিন্দা দিনেশ শর্মা ও রাজকুমার। এদের পার্টনার দেলোয়ার নামে এক বাংলাদেশি। এ ছাড়া শক্তিশালী এ চক্রের অন্যতম সদস্য হিসেবে রয়েছেন বাবা, বল্লভ, বিজয় নামে ৩ শীর্ষ জুয়াড়ি। এ চক্রটিই মূলত নিয়ন্ত্রণ করছে ঢাকার ক্যাসিনো বাণিজ্য। তাদের মাধ্যমে বাংলাদেশে আসা প্রশিক্ষিত চারশরও বেশি নেপালি জুয়াড়ি অনুমতি ছাড়াই দেশের বিভিন্ন নামিদামি রেস্টুরেন্ট ও ক্লাবভিত্তিক ক্যাসিনোয় কাজ করছেন।

এ চক্রের সদস্যরা জনবহুল এলাকা টার্গেট করে প্রথমে রেস্টুরেন্ট বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের নামে কোনো একটি ভবনের এক বা একাধিক ফ্লোর বা কক্ষ ভাড়া নেয়। ধীরে ধীরে সেই ব্যবসার অন্তরালে গড়ে তোলে ক্যাসিনোর র‌্যাকেট। জমজমাট হতেই তারা মোটা টাকার বিনিময়ে অন্য কারও কাছে সেটি হস্তান্তর করে নতুন ভবন টার্গেট করে। একই পদ্ধতিতে সেখানে গড়ে তোলে লাস ভেগাসের আদলে বিশাল জুয়ার আখড়া। এভাবে তারা রাজধানীতেই অর্ধশতাধিক ক্যাসিনো গড়ে তোলে।

ইতিমধ্যে অবৈধ ক্যাসিনো পরিচালনার দায়ে আটক করা হয়েছে অন্তরালে থাকা গডফাদারদের কয়েকজনকে। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বেশ কয়েকটি ক্যাসিনো।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেছেন, রাজধানীতে অবৈধ জুয়ার আড্ডা, ক্যাসিনো চলতে দেয়া হবে না। এসব জুয়ার বোর্ড, ক্যাসিনো পরিচালনা ক্ষেত্রে যতো প্রভাবশালীরাই জড়িত থাকুক না কেন আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে পুলিশ কঠোর হবে।

এসএ/
 

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি