ঢাকা, সোমবার   ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯, || আশ্বিন ৮ ১৪২৬

Ekushey Television Ltd.

ঝরনার গল্প

প্রকাশিত : ২৩:১৬ ৩ মার্চ ২০১৯ | আপডেট: ১৭:৪০ ৪ মার্চ ২০১৯

আমি জন্ম থেকেই খুব চঞ্চল — নিসর্গ কখনো আমাকে বেঁধে রাখতে পারেনি; ব্রহ্মা যখন খোদ গঙ্গাকে কমণ্ডলুতে ধরে রাখতে পারেনি তখন কার সাধ্য আমার গতি রোধ করে? তাই আমি আজন্ম ছুটে চলছি — প্রফুল্ল কল্লোলে, সরল চাঞ্চল্যে, মহানন্দে। গঙ্গা যেমন উন্মত্তভাবে স্বর্গ থেকে নেমে এসেছিল আমিও তেমনি অস্থিরসংকল্পে অদ্রিচূড়া থেকে আছড়ে পড়ি স্থলে — অচল পাথরের সিঁড়ি বেয়ে। নির্জন বন — পাখি ও কীটপতঙ্গের ক্রমাগত ডাক এর নিস্তব্ধতাকে আরো প্রকট করে তোলে; মনে হয় বুঝি এ বন গভীর ঘুমে মগ্ন কিন্তু এ নিস্তব্ধতাকে ছাপিয়ে উঠে আমার অট্টনাদ। পাথুরে মৃদঙ্গে তান তুলে আমি অহোরাত্র গান গাই। এই অচল, গম্ভীর পর্বতে আমি প্রাণ সঞ্চার করি — ধেয়ে চলি আনন্দে, নির্বিঘ্নে, নির্ভয়ে; সাগ্রহে দেখি হরিণের ছুটোছুটি। গঙ্গার মতো আমিও দ্রুতবেগে নেমে আসি ভূতলে — পাথরগুলিকে নির্দয়ভাবে আঘাত করে আর গঙ্গা যেমন শিবের জটাতে স্থান পেয়েছিল আমার জলও তেমনি স্থান পেয়েছে ধরার বুকে। শৈবালের মসৃণ আস্তরে ঢাকা — আমি কোনো রাণীর চেয়ে কম নই। এভাবেই আমি যুগের পর যুগ হেসে-খেলে কাব্যময় ছন্দে ছুটে চলছি। এই অবিরত ছুটে চলার পথে আমি কত কী দেখেছি, শুনেছি, অনুভব করেছি! বহু প্রাণীর ক্ষুদ্র জীবনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গল্প আমি আপন সত্তায় লিখে রেখেছি — এমনই ২ মর্ত্যবাসীর গল্প এতকাল সযত্নে নিজের মাঝে লুকিয়ে রেখেছিলাম কিন্তু আজ তা প্রকাশ করার সময় এসে গেছে।

একটা সময় ছিল যখন আমি লোকচক্ষুর আড়ালে ছিলাম — কোনো মানুষ জানতনা আমার অস্তিত্বের কথা; আমিও জানতামনা ওদের বিষয়ে। এরপর এক পুণ্যপ্রভাতে, যখন আমি সূর্যের রক্তিম আভায় অভিষিক্ত হলাম, যখন পাখিরা নব উদ্যমে গেয়ে উঠল, যখন ধীরে ধীরে জেগে উঠল ঘুমন্ত বন, এখানে প্রথম এক মানুষের আগমন ঘটল — ওর গায়ে ছিল গেরুয়া বস্ত্র, কাঁধে লম্বা ঝোলা ও হাতে শূন্য ভিক্ষাপাত্র। ও সবিস্ময়ে চেয়ে দেখল আমাকে — আমিও অবাক হয়ে দেখলাম ওকে। আমি পাখিদের কণ্ঠে মানুষের বর্ণনা শুনেছিলাম — শুনে মনে হয়েছিল এরা অতি নীচ-হীন-বর্বর কিন্তু ঐদিন যে মানুষের সৌম্যমূর্তি দেখলাম ওকে দেখে মোটেই মনে হলোনা ও হিংস্র। লোকটির ঠোঁটে ছিল মৃদু হাসি, মুখে উজ্জ্বল জ্যোতি ও চোখে অপার বিস্ময় কিন্তু ওর মুখভঙ্গি দেখে মনে হলোনা ও হারিয়ে গেছে; মনে হলো বুঝি একদম ঠিক স্থানে এসেছে। ও আস্তে আস্তে এগিয়ে এল আমার দিকে — অস্ফুট স্বরে উচ্চারণ করল একটিমাত্র নাম — “মহাশ্বেতা।” ঐ পুণ্যলগ্নে প্রথমবারের মতো আমার নামকরণ হলো — আমি পেলাম এক নতুন পরিচয়, মহাশ্বেতা। ও চিৎকার করল, “আজ থেকে এ নির্ঝরিণীর নাম মহাশ্বেতা — ভিক্ষু কাণ্ডবীরের তপোক্ষেত্র, নির্ঝরিণী মহাশ্বেতা।” আগন্তুকের পরিচয় পেলাম — ভিক্ষু কাণ্ডবীর। কাণ্ডবীর ওর সব আভূষণ ত্যাগ করে আস্তে আস্তে আমার জলাশয়ে নামল — হাতজোড় করে করল মন্ত্রোচ্চারণ। পুণ্যস্নান সেড়ে ও আবার বস্ত্র ধারণ করল। এরপর ১টি বড় কড়ই গাছের তলে বসে চোখ বুজে, হাতের তালুগুলি কোলে রেখে ও ধ্যানে মগ্ন হলো। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে গেল — ওর ধ্যান ভঙ্গ হলোনা। অনেকক্ষণ পর ও চোখ খুলল। এরপর ভিক্ষাপাত্রটি নিয়ে কোথায় গেল কে জানে। আমি অবাক হয়ে দেখলাম কাণ্ডবীরকে ও ভাবলাম, “এ কি তাদেরই একজন যারা নির্বিচারে বনের গাছ কেটে ফেলে, পাখিদের শিকার করে ও বনভূমি উজাড় করে নগর গড়ে তোলে? এ কি সত্যই মানুষ?”

ঐদিনের পর থেকে আমি কাণ্ডবীরের তপোক্ষেত্র হয়ে উঠলাম। ও কড়ই গাছের তলে ১টি ক্ষুদ্র কুটিরে থাকত — বেশি আহামরি কিছু নয়; ১টি সাধারণ মাচা মাত্র। উপরে তালপাতার চাল ও সম্মুখে একপ্রস্থ উঠোন। রোজ উষালগ্নে ও আমার কাছে ছুটে আসত — মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে দেখত নতুন দিনের সূর্যোদয়। সূর্যকরে যেমন নিশার অন্ধকার চাদর ক্রমশ খসে পড়ে ও তেমনই আস্তে আস্তে বস্ত্রত্যাগ করে নামত আমার জলাশয়ে — অস্ফুট স্বরে জপ করত কল্যাণ মন্ত্র। কে জানে ঐ কণ্ঠে কী জাদু ছিল — মনে হতো বুঝি কাণ্ডবীরের মন্ত্রবলেই নিশার আঁধার ক্রমশ ঘুচে যাচ্ছে। স্নানান্তে ও কতক্ষণ ঘর ঝাঁট দিত। এরপর ভিক্ষাপাত্র নিয়ে বেরিয়ে যেত ভিক্ষান্বেষণে — ও ফিরে এসে তরুতলে বসে ফল, ভাত, সবজি, যা কিছু পেত তা পরম তৃপ্তিতে খেত। পরে একটু বিশ্রাম নিয়ে অন্যান্য কাজ সেড়ে শুরু করত ধ্যান। সূর্য অস্ত যেত, নিশার আঁধার ঘনিয়ে আসত, প্রদীপশিখা ক্রমশ উজ্জ্বল হয়ে উঠত — ওর চোখের পাতা একটু নড়তও না; দেহ এতটুকু কাঁপত না। মূর্তিবৎ বসে থাকত ঘণ্টার পর ঘণ্টা। শ্বাপদসংকুল বন — চতুর্দিকে গিজগিজ করে সাপ, গিধড়, পন্নগ, এমন কত বনচর! কিন্তু কাণ্ডবীর ছিল সম্পূর্ণ নির্ভয় — বহুকাল বনবাস করতে করতে ও বন্য জন্তুদের সঙ্গে সহাবস্থান করার কৌশল শিখে গেছিল। একবার ওর ধ্যানের সময় ১টি বিষাক্ত সাপ নেমে এসেছিল গাছ থেকে কিন্তু ওর তেজোদ্দীপ্ত মুখশ্রী দেখে এর চোখ ধাঁধিয়ে গেছিল — কবার ছোবল দিতে গিয়েও পারলনা। সাপটি ওখানেই অচল হয়ে পড়ে থাকল আর যেই কাণ্ডবীর চোখ খুলল ওটা নীরবে গড়িয়ে গড়িয়ে চলে গেল। ও কিছু টেরও পেলনা —  কী আশ্চর্য একাগ্রতা! ধ্যান শেষে ও প্রদীপ নিভিয়ে ঘুমোত কিন্তু বেশিক্ষণ নয়। গভীর রাতে আবার জ্বলে উঠত ওর প্রদীপ — উষা অবধি চলত ওর ধ্যান।

এভাবে কতকাল কেটে গেল কে জানে — সময়ের হিসেব শুধু মানুষই রাখে, নিসর্গ নয়। যা হোক, এভাবে চলতে চলতে একদিন এ স্বাভাবিকত্বের ব্যত্যয় ঘটল। এ তপোক্ষেত্রে এক নতুন ব্যক্তির আগমন হলো — এক নারী; এক হাতে ঘট ও অন্য হাতে কুঠার নিয়ে ত্রস্তপদে গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল। ও দারুণ বিস্ময়ে দেখল আমাকে — জ্বলজ্বল করে উঠল ওর চোখের মণি। এদিক-ওদিক তাকিয়ে ধাঁ করে ছুটে এল আমার কাছে — ঘট ও কুঠারটা মাটিতে রেখে সে মহানন্দে মুখে জল ছিটাল, হাত ধুলো ও খিলখিল করে হাসল। কী অপূর্ব হাসি! হাসির চোটে ওর দুলগুলি তরুলতার মতো কেঁপে উঠল — ওর হর্ষধ্বনি শুনে মনে হলো বুঝি জলে মুক্তো ঝরে পড়ছে। এই উদ্দাম হাসিতে ওর আলগা খোঁপা খুলে পড়ল। কে ছিল এই নারী? ও কোথা থেকে এমন ঝড়ের বেগে এসে কাণ্ডবীরের তপোক্ষেত্রের গাম্ভীর্য একদম তছনছ করে দিল? মেয়েটি গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে ঘটে জল ভরতে লাগল — মুগ্ধচোখে দেখল আপন প্রতিচ্ছবি কিন্তু ১টির বদলে ২টি মুখের প্রতিচ্ছবি দেখে ও চমকে উঠল; সাঁই করে কুঠারটা তুলে নিয়ে ঘুরে দাঁড়াল। না, কোনো দস্যু/আরণ্যক নয় — এক বৌদ্ধ ভিক্ষু; মেয়েটির অস্ত্র দেখে ও কয়েক পা পিছে দাঁড়াল। ও লজ্জায় তা সরিয়ে নিল — ব্যাপারটা এত অকস্মাৎ ঘটে গেল যে কেউই শুরুতে কিছু বলতে পারলনা। এরপর কাণ্ডবীর বলল, “কে তুমি? এখানে এলে কি করে?” মেয়েটি ইতস্তত করছে দেখে বলল, “ভয় পেওনা — আমি তোমার কোনো ক্ষতি করবনা। তুমি নির্ভয়ে বলো — তোমার নাম কী? কোথা থেকে এসেছ?”

— “আ-আজ্ঞে, আমার নাম দর্শী। আমি ফুল্লন গ্রামে থাকি।”

— “ফুল্লন গ্রাম? আমি তো প্রায়ই ওখানে ভিক্ষা করতে যাই কিন্তু ওখানকার কেউ তো এ স্থান সম্পর্কে জানেনা। তুমি জানলে কি করে?”

— “শব্দ! শব্দ শুনেছি।”

— “শব্দ?”

— “হ্যাঁ, বনের ধার অবধি এ ঝরনার শব্দ শোনা যায় — আমার কুটির থেকেও। এ শব্দের পিছে ছুটে ছুটেই আমি এ থান খুঁজে পেয়েছি। অছুঁত বলে গ্রামের লোকে নদী থেকে জলও নিতে দেয়না কিন্তু এখানকার জল নিতে তো আর কেউ আমাকে বারণ করেনি। তাই আমি এখানে চলে এসেছি জল তোলার জন্য।”

কাণ্ডবীর অবাক হলো ওর কথা শুনে — বলল, “তুমি জল তোলার জন্য একাই চলে এলে এতদূর? একটু ভয়ও হলোনা?” ও তখন ঋজু হয়ে দাঁড়াল — সদম্ভে বলল, “আমি কোনোকিছুকে ভয় পাইনা — (কুঠার উঁচিয়ে) বাপের কুঠার যদ্দিন আমার কাছে আছে তদ্দিন কেউ আমার ক্ষেতি করতে পারবেনা।”

— “তোমার পিতা বুঝি”— 

— “মারা গেছেন। পরিবার বলতে আছে শুধু এক বুড়ো মা — ও কাজ করতে পারেনা। তাই আমি কাঠ কেটে হাটে বিক্রি করি। আমরা শূদ্র — সকলে কাঠ কিনতে চায়না, তবু কষ্ট করতে হয়। ভিক্কে করে খাবার চেয়ে তো ভাল আছে।”

কাণ্ডবীর মুগ্ধ হলো ওর সাহস ও আত্মবিশ্বাস দেখে — মৃদু হেসে একটু মাথা নাড়ল। এরপর বলল, “তোমার ঘট ভেসে যাচ্ছে।” দর্শী পিছন ফিরে দেখল ঘটটি জলের স্রোতে ভেসে যাচ্ছে — ও দ্রুত হাত বাড়িয়ে তা ধরে ফেলল; জল ভরে কাঁধে তুলে কাণ্ডবীরের দিকে ফিরে প্রশ্ন করল, “আচ্ছা আপনি কে?” ও তখন সবিস্তারে নিজের পরিচয় দিল, “আমি এক বৌদ্ধ ভিক্ষু — একাপর্ণিকাতে যে বৌদ্ধ বিহারটি আছে আমি ওখানকার ছাত্র ছিলাম। ৩ মাস হলো বিহার ত্যাগ করে মহাশ্বেতার পাদদেশে বাস করছি।”

— “মহা-কী?”

— “মহাশ্বেতা — এ নির্ঝরিণীর নাম। আমি রেখেছি।”

— “ও, আপনি বুঝি এখানেই থাকেন?”

— “হ্যাঁ, ঐ তো আমার গৃহ।”

দর্শী কড়ই গাছের দিকে তাকাল — সত্যিই ওখানে ১টি ক্ষুদ্র মাচা ছিল; ক্রীড়ার উত্তেজনাতে ততক্ষণ লক্ষ্যই করেনি। ও জিভ কেটে বলল, “এ মা, আমি একদমই জানতামনা এখানে আপনার মতো ঋষি থাকে — জানলে আমি এখানে আসতামনা। আমাকে ক্ষমা করবেন।”

— “ও মা, এভাবে বলছ কেন? নিসর্গের দানে সবার অধিকার আছে — তোমার যখন ইচ্ছা তুমি এখানে আসতে পার।”

— “সত্যি?”

— “সত্যি।”

ঐদিন আর দুজনার কথা হলোনা — দর্শী কাণ্ডবীরকে প্রণাম করে চলে গেল। ওর অনুমতি পেয়ে ও রোজ এখানে আসতে লাগল। প্রায়ই কাণ্ডবীরের সঙ্গে দেখা হতো কিন্তু ও ভিক্ষান্বেষণে গ্রামে গেলে আর দেখা হতোনা। দর্শী একদিন কাঁদতে কাঁদতে ওর কাছে ছুটে এসে বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষা নেবার ইচ্ছা ব্যক্ত করল। কাণ্ডবীর প্রশ্ন করল, “তুমি কি সত্যই তোমার ধর্ম ত্যাগ করতে চাও?”

— “হাহ, আমার আর ধম্ম ভান্তে! আমি শূদ্রানী — মন্দিরে পা দেবারও আমার অধিকার নেই। যে দেবতা আমাকে ছেড়েছে ওর দেয়া ধম্ম আমি চাইনে। দিন ভান্তে, আমাকে দিক্ষে দিন।” ঐদিন থেকেই শুরু হলো দর্শীর দীক্ষা। কাণ্ডবীর ওকে কষ্ট, এর কারণ ও প্রতিকার সম্পর্কে বলত। শোনাত বুদ্ধের জীবনগাথা — কেন সে রাজ্য ত্যাগ করেছিল, কষ্টের কারণ জানতে কত কঠিন তপস্যা করেছিল, কি করে নির্বাণ লাভ করেছিল, এসব। দর্শী সবকিছু বুঝত না কিন্তু খুব মনোযোগ দিয়ে শুনত — গুরুর আদেশ-উপদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করত। দর্শী কাণ্ডবীরের সেবা করতে উদগ্রীব ছিল কিন্তু কাণ্ডবীর ছিল স্বনির্ভর — ও কখনো দর্শীর সেবা গ্রহণ করত না; এতে ও একটু মনোক্ষুণ্ন হতো বটে কিন্তু কখনো গুরুর বিরুদ্ধাচরণ করতনা। দর্শীর মাধ্যমে ফুল্লন গ্রামে কাণ্ডবীরের খ্যাতি ছড়াতে লাগল — ওর ধর্মকথা শুনতে ২-৩জন করে ক্রমে আরও লোক আসতে লাগল এখানে; এতকালের অনাবিষ্কৃত মহাশ্বেতা এবার জনসমক্ষে পরিচিতি লাভ করল। কাণ্ডবীরের নিভৃত জীবন ভরে উঠল কর্মব্যস্ততায় — ভক্তদের ধর্মোপদেশ দিতে দিতেই কেটে যেত দিনের অনেকটা সময় কিন্তু কাণ্ডবীর এতে মোটেই বিরক্ত হতোনা; হাসিমুখে ব্যাখ্যা করত ন্যায়-অন্যায়, ধর্ম-অধর্ম, সত্য-অসত্যের জটিল তত্ত্ব। ও কখনো নিজের ভক্তদের মধ্যে বিভেদ করতনা; সদাই শোনাত সাম্যের কথকতা কিন্তু প্রত্যেকে হয়তো ওর সাম্যের বাণী সাদরে গ্রহণ করতে পারেনি । এদের অনেকেই কাণ্ডবীরের আশ্রমে দর্শীর নির্বিঘ্ন যাতায়াত ভাল মনে মেনে নিতে পারেনি — একজন তো একদিন বলেই ফেলল, “ঐ মাগিকে বেশি লাই দেবেননা ভান্তে — ওর মতিগতি ভাল নয়।” কাণ্ডবীর তখন ওকে কানে কানে কি যে বলল, ঐ ব্যক্তি আর কখনো এখানে আসেনি। হায়, দর্শী তখন গাছের পিছে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল — ঐদিন আর ও কাণ্ডবীরের কাছে যায়নি; উল্টো ঘুরে চলে গেছিল।

বর্ষা এল — কৃষ্ণবর্ণ মেঘে ছেয়ে গেল অম্বর, নবরূপে সেজে উঠল অটবী, আমি পেলাম নবযৌবন কিন্তু এ আনন্দযজ্ঞ সম্পূর্ণ হলোনা কেননা আনন্দময়ী দর্শীই ছিল অনুপস্থিত। সেই যে এক গ্রীষ্মের ভোরে ও উদাস মনে এখান থেকে চলে গেছিল, আর ও এখানে আসেনি। কাণ্ডবীর হয়তো একটু চিন্তিত হয়েছিল কিন্তু নিজের স্বাভাবিক স্থৈর্য বজায় রেখে ও কাউকে কোনো প্রশ্ন করেনি। এরপর এক পূর্ণিমা রাতে যখন ও ধ্যানে মগ্ন ছিল কারো কান্নার শব্দ শুনে ওর ধ্যান ভঙ্গ হলো — দেখল দর্শী ওর পায়ের কাছে বসে কাঁদছে। ও সবিস্ময়ে বলে উঠল, “দর্শী! তুমি এত রাতে এখানে? কী হয়েছে? ক্রন্দন করছ কেন?” দর্শী চেঁচিয়ে বলল, “আমি পাপ করেছি ভান্তে; আমি পাপী! পাপের জ্বালা সইতে না পেরে আমি আপনার কাছে এসেছি।”

— “আহ, কী হয়েছে তা তো বলবে।”

— “আমি নষ্টা ভান্তে; আমি পাপী! আমার পাপের কোনো ক্ষমা নেই।”

— “তোমার চিত্ত অশান্ত দর্শী — কী হয়েছে আমাকে বলো; আমি তোমাকে মুক্তির পথ বলে দিচ্ছি।”

দর্শী আরো এক দফা কেঁদে বলল, “আমি একজনকে মন দিয়ে ফেলেছি ভান্তে!” কাণ্ডবীর কতক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “তুমি…প্রেমাসক্ত হয়েছ — এতে পাপের কী আছে?”

— “আছে ভান্তে, আছে। আমি যাকে মন দিয়েছি ও মহাপুরুষ — মেয়েলোক ছোঁয়াও ওর বারণ কিন্তু আমি এমনই পোড়ামুখী, আমি ওকেই আমার মন দিয়ে ফেলেছি।”

কাণ্ডবীর কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। এরপর জিজ্ঞাসা করল, “তবে তুমি কেন ওকে ভালবাস দর্শী?” ও ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে বলল, “কি করে না বাসি ভান্তে? ও যে আর ৮-১০টা লোকের মতো নয় —  জীবনে কারো কাছে যে মান পাইনি ওর কাছে ১দিনেই তা পেয়েছি। আর ১০টা লোকের মতো ও কখনো আমাকে হেয় করেনি — কাঙালনী বলে কখনো গাল দেয়নি। ওর কাছে যে মানুষের মান পেয়েছি এই তো আমার ভাগ্যি — ওকে যে আমি আমার সোয়ামি ভেবে নিয়েছি কিন্তু আমার এমনই কপাল, ও আমাকে গেহোন করতে পারেনা!” কাণ্ডবীরের মুখ কঠিন হয়ে গেল — নির্বিকারভাবে বলল, “ও কে দর্শী?” দর্শী কেঁদেই গেল — কিছু বলল না। কাণ্ডবীর কঠিন স্বরে বলল, “আমি তোমাকে কিছু জিজ্ঞাসা করেছি দর্শী — আমি জানতে চাই ও কে।” দর্শী কেঁদে কেঁদে বলল, “ও আমি বলতে পারবনা ভান্তে।” কাণ্ডবীর আরো জোর দিয়ে বলল, “বলতে হবে! আমি আদেশ করছি দর্শী —  আমাকে বলো ও কে।” দর্শী কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। এরপর আস্তে আস্তে মুখ তুলে বলল, “সে তো আপনার অজানা নয় ভান্তে।” কাণ্ডবীর ক্ষিপ্রগতিতে উঠে দাঁড়াল — দেখে দর্শী একটু চমকে গেল। ও কিছু না বলে ছুটে এল আমার কাছে — দর্শী ভয়ে ভয়ে উঠে দাঁড়াল। কাণ্ডবীর চীরবস্ত্র না খুলেই নেমে পড়ল জলে — ১বার, ২বার, ৩বার… কতবার ডুব দিল কে জানে। ঐরাতে ছিল ভরা পূর্ণিমা — চন্দ্র তার দুধেল জ্যোৎস্না ঢেলে দিয়েছিল আমার জলে। ঐ চন্দ্রকরে দর্শী অপলক চোখে দেখল কাণ্ডবীরের গৌর কায়া, দীপ্ত মুখ ও নগ্ন বক্ষ। স্নানান্তে ও জলাশয় থেকে উঠে ঘরে ঢুকল — ঝোলা ও ভিক্ষাপাত্রটি নিয়ে বেরিয়ে এল। এরপর ১টি মশাল জ্বালিয়ে ছুঁড়ে মারল ঘরের চালে — দাউদাউ করে জ্বলে উঠল ঐ মাচা। দর্শী কিছু বলল না — কাঠের পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে গেল সব। এরপর কাণ্ডবীর ওর কাছে গিয়ে বলল, “আমি চলে যাচ্ছি দর্শী; আমার শেষ আদেশ — ওকে তোমার ভুলতে হবে।” দর্শী ওকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করল কিন্তু মুখ তুলে দেখল ও নেই — এর আগেই ও এখান থেকে চলে গেছিল; ১বার ঘুরেও তাকায়নি। দর্শী বনের মাঝে একা একা পড়ে রইল। এরপর শুষ্ক কণ্ঠে বলল, “ওকে ভুলতে হবে — ভান্তের আদেশ।” এরপর পিছন ফিরে আস্তে আস্তে এগিয়ে গেল ঐ জ্বলন্ত মাচার দিকে। বাদুড়গুলি চেঁচিয়ে উঠল, পেঁচাগুলি “হু হু” করে ডেকে উঠল, দূরে কোথাও শোনা গেল শেয়ালের চিৎকার। দৈবাৎ পূর্ব থেকে ছুটে এল একদল মেঘ — রাহুর মতো গ্রাস করল চন্দ্রকে; বিরহিণীর অশ্রুর মতো নেমে এল জলধারা।

পরদিন দুপুরে ভক্তরা যথারীতি চলে এল কিন্তু দর্শী/কাণ্ডবীর কাউকে খুঁজে পেলনা। ঐ বৃষ্টিসিক্ত দুপুরে মহাশ্বেতার পুণ্যক্ষেত্র ছিল শূন্য — কড়ই গাছের তলে পড়ে ছিল শুধু একগাদা ছাই।

এরপর বহু শতক কেটে গেছে — কত বিহার বিধ্বস্ত হয়েছে, কত ফুল্লন গ্রাম নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, কত একাপর্ণিকা হয়ে গেছে ধূলিসাৎ! কিন্তু আমি এখনো আছি — চিরপ্রফুল্ল, চিরপ্রাণবন্ত, চিরবহমান। আজ আমি পর্যটন কেন্দ্র হয়েছি — লক্ষ লক্ষ মানুষ রোজ এখানে ছুটে আসে আমাকে দেখতে। এরা ঐ ২জনের মতো নয় — এদের ভাষা, চালচলন, জামাকাপড়, সবই ভিন্ন। এরা আজ আমাকে নতুন নামে ডাকে কিন্তু এরা তো জানেনা আমার ১টাই পরিচয় — মহাশ্বেতা। যদি কখনো এখানে আসো তবে দেখবে আমার পাদদেশের ১টি কোণে ঘন ঝোপঝাড়ের আড়ালে কাণ্ডবীরের পাথরটি এখনো আছে। অন্তশ্চক্ষু দিয়ে তাকালে দেখতে পাবে — দর্শী কাণ্ডবীরের পায়ের কাছে বসে আছে। হয়তো শুনতেও পাবে — ও কাণ্ডবীরকে বলছে, “ভান্তে, মহাশ্বেতা মানে কী?”

এসি

 

 

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি