ঢাকা, বুধবার, ২১ নভেম্বর, ২০১৮ ৩:৫৪:৪৬

Ekushey Television Ltd.

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সবকটি বিজনেস ওরিয়েন্টেড: আবুল কাসেম

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ০৫:৩০ পিএম, ২ অক্টোবর ২০১৮ মঙ্গলবার | আপডেট: ০৬:১৫ পিএম, ১১ অক্টোবর ২০১৮ বৃহস্পতিবার

দেশের একাডেমিক শিক্ষার সর্বোচ্চ সনদ নিয়েও বছরের পর বছর পার করে দিচ্ছে শিক্ষার্থী, চাকরি মিলছে না। স্নাতকোত্তর পাশের পর তিন থেকে চার বছর আবার চাকরির জন্য আলাদাভাবে প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে। করতে হচ্ছে কোচিংও। তাহলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার গলদটা আসলে কোথায়?

 অন্যদিকে দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও কোচিং সেন্টারগুলোর বিরুদ্ধে আছে বাণিজ্য করার দীর্ঘদিনের অভিযোগ। কিভাবে বাণিজ্য থেকে এসব  প্রতিষ্ঠানকে বের করা যায়? কিভাবে শিক্ষাকে নিরেট সেবায় পরিণত করা যায়? কিভাবে তরুণ সমাজের মধ্যে ক্ষয়ে যাওয়া নীতি-নৈতিক জাগ্রত করা যায়?

এসব প্রশ্নের সুলোক সন্ধানে একুশে টেলিভিশন অনলাইন মুখোমুখি হয় বাংলাদেশের প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও রাষ্ট্রচিন্তাবিদ অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের।যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক। তিনি নিরপেক্ষ রাজনীতি চিন্তা ও তত্ত্বে বিশেষভাবে পরিচিত।

দুই পর্বের বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, বেকারত্ম আমাদের দেশে অনেক বড় একটি সমস্যা।মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে এ সমস্যা বাড়তে বাড়তে আজ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।বিপুল সংখ্যক যুবক-যুবতী বেকারত্মের গ্নানি নিয়ে জীবন যাপন করছে।তারপরও আজও আমরা কার্যকরি কোন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারিনি।বেকারত্ম দূর করতে আমরা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকেও ঢেলে সাজাতে পারিনি। শিক্ষা ব্যবস্থাকে করতে পারিনি কর্মমুখী।চাকরির বাজারের পরিবর্তীত চাহিদা অনুযায়ী আমরা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় কৃষি ও শৈল্পিক উৎপাদনের বিষয় আনতে পারলে বেকারত্ব অনেক কমে যেত।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন একুশে টেলিভিশন অনলাইন প্রতিবেদক রিজাউল করিম। পাঠকের উদ্দেশ্যে সাক্ষাৎকারের প্রথম পর্বটি আজ তুলে ধরা হলো-

একুশে টেলিভিশন অনলাইন: দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ২৫ লাখেরও বেশি। বিবিএসের রিপোর্ট অনুযায়ী গত এক বছরে আরও ৮০ হাজার বেকার বেড়েছে। দেশের এই বিশাল জনশক্তিকে আমরা কেন কাজে লাগাতে পারছি না? কেন সর্বোচ্চ পর্যায়ের ডিগ্রি নেওয়ার পরও চাকরি মিলছে না? কেন আমরা বেকার থাকছি?

আবুল কাসেম ফজলুল হক: এটা জাতি হিসেবে আমাদের বড় একটি সমস্যা।যদি বেকারদের কর্মসংস্থান হতো, জাতীয় উৎপাদনের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা হতো, তবে দেশ অর্থনৈতিকভাবে আরো অনেক এগিয়ে যেত।তবে বেকারত্বের এমন ভয়াবহতা সৃষ্টির কারণ হলো আমাদের সুনির্দিষ্ট কোন পরিকল্পনা না থাকা। বেকার সমস্যা সামনে রেখে জাতিকে উন্নত করতে শিক্ষা ব্যবস্থা গঠনের কোন পরিকল্পনা নেই।স্বাধীনতা পরবর্তী এমন কোনো পরিকল্পনা কেউ নিতে পারেনি। ফলে বেকারত্ব দিনের পর দিন বেড়ে আজকের এ পর্যায়ে এসেছে।

যদি কর্মসংস্থানের বিবেচনা সামনে রেখে শিক্ষা ব্যবস্থাকে পুনর্গঠিত করা হয়, তবে বেকার সমস্যা সম্পূর্ণ সমাধান করতে না পারলেও অনেকটা সমাধান হবে।

একুশে টেলিভিশন অনলাইন: কর্মসংস্থানের বিবেচনায় শিক্ষা ব্যবস্থায় কোন কোন দিক স্পষ্ট হওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?

আবুল কাসেম ফজলুল হক: শিক্ষা ব্যবস্থার একটা লক্ষ্য হওয়া উচিত- দেশের বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী যেন শিক্ষা লাভ করার পরে সরাসরি উৎপাদনের কাজে জড়িত হতে পারে। প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে ক্লাস ফাইভ পাশ করার পরেই কৃষি উৎপাদন এবং শিল্প উৎপাদনের মতো কিছু প্রযুক্তিগত ও কারিগরি শিক্ষা দেওয়া যায়। এটা করলে ক্লাস ফাইভ পাশের পরই বিপুল সংখ্যক ছাত্র-ছাত্রী এই কর্মসংস্থানমূলক শিক্ষা নিতে উৎসাহিত হবে।

মোট কথা শিক্ষা ব্যবস্থা এমন হতে হবে যে শিক্ষার্থীদের একটা বড় অংশ উৎপাদনমুখী হবে। আর একটা অংশ প্রশাসনিক কাজে যাব।তৃতীয় অংশটি বৈজ্ঞানিক-দার্শনিক বা আবিষ্কারক হবে।অর্থাৎ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মূলে রাখতে হবে উৎপাদনমূখী শিক্ষা।

একুশে টেলিভিশন অনলাইন: চাকরির বাজার ও বাস্তবতার ভিত্তিতে বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কি?

আবুল কাসেম ফজলুল হক: চাকরির বাজার ও বাস্তবতার ভিত্তিতে শিক্ষা কারিকুলাম শতকরা ১০ ভাগ উপযোগিতা রাখে।এর জন্য দায়ী আমাদের শিক্ষা কমিশন। শিক্ষা কমিশন যাদের নিয়ে গঠিত তাদের মধ্যে শিক্ষার কোন উপলব্ধি-ই নাই। সর্বশেষ ২০১০ সালে গৃহিত শিক্ষা নীতিতে শিক্ষাবীদ ও শিক্ষকের ভূমিকা কম আছে। এখানে ভূমিকা আছে যারা এনজিও করেন তাদের মতো লোকের।যারা বিদেশী নানা সংস্থার সঙ্গে জড়িত বা সুশিল সমাজের হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন।শিক্ষা কমিশন করতে যথেষ্ঠ জাতীয়তা বোধের দরকার আছ।শিক্ষা উপলব্ধির দরকার আছে।এটা করতে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে চেতনা না আসলে হবে না।

একুশে টেলিভিশন অনলাইন: দেশের শিক্ষা ও পরীক্ষা পদ্ধতিতে নতুন সংযোজন সৃজনশীল। এ পদ্ধতি সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কি?

আবুল কাসেম ফজলুল হক: সৃজনশীল পদ্ধতি ও ঘন ঘন পরীক্ষা পদ্ধতি অবিলম্বে বাতিল করা উচিৎ।এমন একটি পদ্ধতি চালু করা উচিত যেখানে ছাত্ররা আনন্দ খুঁজে পায়। সেক্ষেত্রে ব্রিটিশ আমলে যে শিক্ষা পদ্ধতি ছিল তার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নতুন পদ্ধতি খুঁজে বের করতে হবে। প্রাইমারী-মাধ্যমিক ও উচ্চ-মাধ্যমিক পর্যায়ের সিলেবাস পরিবর্তন করতে হবে।সেখানে যুগের চাহিদা অনুযায়ী ব্যবহারিক বিষয় আনতে হবে।

একুশে টেলিভিশন অনলাইন: বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিরুদ্ধে বাণিজ্যের ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে।এ থেকে বেরিয়ে এসে শিক্ষাকে নিরেট সেবায় পরিণত করার মূলমন্ত্র কি হতে পারে? 

আবুল কাসেম ফজলুল হক: এতে কোন সন্দেহ নেই যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এক একটা ব্যবসা কেন্দ্র।যারা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন, যারা বিশ্ববিদ্যালয় ট্রাস্টি বোর্ডের মেম্বার, তারা অর্থ আয়ের জন্যেই বিশ্ববিদ্যালয় করেছেন।দেখা যাচ্ছে একজন কোনো ব্যবসা করতেন। তিনি ভাবলেন একটা শিল্পকারখানা করবেন।

হিসেব করে দেখলেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা তার জন্য শিল্পকারখানা তৈরির চেয়ে লাভজনক।তাই সে লাভের হিসেব করেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছে।সেখানকার শিক্ষায় সেবার চেয়ে ব্যবসায়িক দিকটা দেখা যায় বেশি। এই ব্যবসায়িক লাভের কারণেই আজকে শতাধিক বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে। এর প্রত্যেকটাই বিজনেস ওরিয়েন্টেড।

যেটা একটা জাতির জন্য কখনও কল্যাণকর নয়।তারা যুক্তি দেখাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ অন্য দেশে এ রকম বিশ্ববিদ্যালয় আছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে ওই সব দেশের মতো বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে উন্নত নয়।

এ অবস্থায় আমাদের যেটা করণীয় সেটা হলো-বেরসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি বিশ্ববিদ্যালযে যে  বৈষম্য সেটা কমিয়ে আনা।বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও দেশ, ভাষা ও জাতীয়তার বিষয়গুলোও সন্নিবেশ ঘটানো। আমাদের সংস্কৃতি সেখানে ঢোকানোর ব্যবস্থা করতে হবে।বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিদেশি সাম্রাজ্যবাদী চেতনা নিয়ে চলছে।এটা বন্ধ করা দরকার।এরা এমন শিক্ষার্থী তৈরি করছে,যারা বিদেশি নাগরিকত্বে আগ্রহী।

একুশে টেলিভিশন অনলাইন: বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো দেশে গড়ে ওঠা কোচিংগুলোর বিরুদ্ধে বেপরোয়া বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অনেকেই আবার স্কুলের পাঠ  নেওয়ার চেয়ে কোচিংয়ের শিক্ষাকে গরুত্ব দিচ্ছেন। বিষয়টি আপনি কিভাবে দেখছেন? 

আবুল কাসেম ফজলুল হক: আজকে যে গাইড বই, কোচিং সেন্টার এটা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য খুবই ক্ষতি বয়ে আনছে।শিক্ষার গতি গাইড ও কোচিং সেন্টারমুখী হওয়ার কারণে ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে আনন্দ নেই। তারা এক প্রকার গলাধকরণের নীতিতে বেড়ে উঠছে।অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা মনে করে কোচিং সেন্টারে যাওয়া উচিত নয়, তবে তারা এটা মনে করলেও বাধ্য হয়ে যাচ্ছে। এটা বন্ধে রাষ্ট্রকেই উদ্যোগ নিতে হবে। স্কুলগুলোতে শিক্ষার মান বাড়াতে হবে।

এ সংক্রান্ত আরও খবর

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো টাকার জন্য শিক্ষাকে টার্গেট করেছে

/ এআর /

 



© ২০১৮ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি