মৃত্যুদণ্ড রমজানের, জেল খাটছেন দিনমজুর সোনা মিয়া
প্রকাশিত : ১৭:০৬, ১৪ আগস্ট ২০২৬
কক্সবাজারে ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবা উদ্ধারের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এক আসামিকে ঘিরে চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। মামলার এজাহারে যাকে ‘সোনা মিয়া’ হিসেবে উল্লেখ করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, ওই নামে কারাগারে থাকা ব্যক্তি বলছেন, তিনি ওই মামলার আসামিই নন।
পুলিশের তদন্তেও উঠে এসেছে, ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেফতার হওয়া ‘সোনা মিয়া’ এবং ২০২৬ সালে মৃত্যুদণ্ডের পর গ্রেফতার হওয়া সোনা মিয়া একই ব্যক্তি নন। এ নিয়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা।
মামলার বিবরণে জানা যায়, ২০২০ সালের ১ মার্চ দুপুরে কক্সবাজার জেলা গোয়েন্দা পুলিশ খবর পায় রামু উপজেলার জোয়ারিয়ানালা ইউনিয়নের উত্তর মিঠাছড়ি এলাকায় কতিপয় মাদককারবারি চালান লেনদেন করছে। এই খবরে ডিবি পুলিশের একটি দল পৃথক অভিযান চালিয়ে ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ ৫ জনকে আটক করে।
ঘটনায় পরদিন (২ মার্চ) ৫ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত ৪/৫ জনকে আসামি করে কক্সবাজার সদর থানায় মামলা দায়ের করা হয়। ঘটনার সময় গ্রেপ্তার এক আসামির পকেটে পাওয়া জন্মনিবন্ধন সনদের ফটোকপির সূত্র ধরে পুলিশ মামলার এজাহারে ২ নম্বর আসামির নাম উল্লেখ করেন ‘সোনা মিয়া’। পরে ওই আসামি দীর্ঘ ২ বছরের বেশি জেলহাজতে থাকার পর বিগত ২০২২ সালের ১৩ জুন উচ্চ আদালত থেকে জামিনে বের তিনি আত্মগোপনে চলে যান।
এরমধ্যে দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার পর চলতি বছর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আদালত ওই মামলায় ‘সোনা মিয়া’সহ সংশ্লিষ্ট ৫ আসামির বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেন। রায়ের পর গত ২৩ জুন র্যাব-১৫ এর একটি দল চকরিয়ার ডুলাহাজার থেকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানামূলে ‘সোনা মিয়াকে’ গ্রেপ্তার করে। পরে তাকে আদালতে পাঠানো হলে বিচারক কক্সবাজার জেলা কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
গ্রেপ্তার ‘সোনা মিয়া’ কারান্তরীণ হওয়ার পরই আসামিকে নিয়ে সৃষ্টি হয় নতুন প্রশ্নের। আর এই প্রশ্নকে ঘিরে সামনে আসে ‘আয়নাবাজি’র মত চাঞ্চল্যকর গল্পের।
কারাগারে যাওয়ার ২/৩ দিন পর ‘সোনা মিয়া’ কারাগারের জেল সুপার বরাবর আবেদন করে দাবি করেন, তিনি এই মামলার আসামি নন। পরে জেল সুপার ওই মামলায় ইতিপূর্বে জেলহাজত থেকে জামিনে বের হওয়া আসামি সোনা মিয়ার সঙ্গে বর্তমানে কারান্তরীণ ‘সোনা মিয়া’র ছবি, ফিঙ্গার প্রিন্ট, ঠিকানা ও তথ্যের গড়মিল খুঁজে পান। এরপর জেল সুপার বিষয়টি জেলা ও দায়রা জজের লিখিতভাবে অবহিত করেন।
আদালত বিষয়টি যাচাই করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য কক্সবাজার সদর থানা পুলিশকে নির্দেশ দেন। গত ২ জুলাই পুলিশ আদালতে এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন দাখিল করেন। এতে রহস্যের জট খুলে আসামি নিয়ে ‘আয়নাবাজি’ গল্পের।
যেখানে উঠে এসেছে, গত ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার, পরে জামিনপ্রাপ্ত সোনা মিয়া এবং র্যাবের অভিযানে গ্রেপ্তার সোনা মিয়া একই ব্যক্তি নন। ঘটনার প্রথমে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির প্রকৃত নাম রমজান।
প্রাপ্ত তথ্য বলছে, ঘটনার সময় গ্রেপ্তার হওয়া আসামিদের মধ্যে ২ নম্বর আসামির প্রকৃত নাম ছিল রমজান। তিনি নিজেকে ‘সোনা মিয়া’ বলে পুলিশের কাছে পরিচয় দেন এবং পরে পুলিশকে একটি জন্মনিবন্ধন কার্ড দেখান।
আর মামলাটি দায়ের, আদালতে অভিযোগপত্র দাখিলসহ পুরো বিষয়ে তদন্তকারি কর্মকর্তার চরম গাফেলতি রয়েছে বলে জানান কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মো. আব্দুল মান্নান।
তিনি বলেন, এতগুলো ধাপ পার হয়ে আসল আসামি রমজান আলীর পরিবর্তে সোনা মিয়া নামের ব্যক্তি কারাভোগ পর্যন্ত করছেন, এটি প্রশাসনের অবহেলা ছাড়া কিছুই নয়।
বিষয়টি স্বীকার করে কক্সবাজার সদর থানার ওসি বলেন, এটি আয়নাবাজি সিনেমার চেয়ে কম নয়। ভুক্তভোগী সোনা মিয়া গ্রেপ্তারের পর আইন শৃংখলা বাহিনী ও আদালতে নির্দোষ দাবি করেননি। মূলত কারান্তরীণ হয়ে মৃত্যুদণ্ডের সাজাপ্রাপ্ত আসামি জানার পরই নিজেকে নির্দোষ ও মামলার এজাহারে উল্লেখিত কথিত ‘সোনা মিয়া’ নন বলে দাবি করেন। এ নিয়েও রহস্য থেকে গেছে বলে মন্তব্য ওসির।
এএইচ
আরও পড়ুন










