ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ১৮ জুলাই ২০১৯

যেভাবে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্রে ধ্বংস হয়েছিল ইরানী বিমান 

 প্রকাশিত: ২১:১০ ২১ জানুয়ারি ২০১৯   আপডেট: ২২:০৫ ২১ জানুয়ারি ২০১৯

"আমরা সত্যি একটি যাত্রীবাহী বিমান গুলি করে ভূপাতিত করেছিলাম। এমন একটা ঘটনা যে ঘটতে পারে, তা আমার এখনো বিশ্বাস হতে চায় না।"      

রুডি পাহোইয়ো - আমেরিকান নৌবাহিনীর একজন সামরিক ক্যামেরাম্যান - এমনভাবেই বর্ণনা করছিলেন ১৯৮৮ সালের জুলাই মাসের তিন তারিখের সেই ঘটনার কথা - যেদিন তার চোখের সামনেই যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস ভিনসেন্স থেকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে ধ্বংস করা হয় একটি ইরানী যাত্রীবাহী বিমান।

নিহত হয় বিমানটির ৬৬টি শিশু সহ ২৯০ জন আরোহীর সবাই।    

বন্দর আব্বাস থেকে দুবাইগামী একটি নিয়মিত ফ্লাইটের ওই বিমানটি পারস্য উপসাগরের ওপরে উড়ছিল। কিন্তু মার্কিন যুদ্ধজাহাজটি ভুল করে ওই যাত্রীবাহী বিমানটিকে শত্রু বিমান বলে চিহ্নিত করে এবং তার দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে।

ঘটনাচক্রে সেই দিন ইউএসএস ভিনসেন্স-এ ছিলেন মার্কিন নৌবাহিনীর ক্যামেরাম্যান রুডি পাহোভো, এবং তার সহকর্মীরা - যাদের কাজ হলো যুদ্ধ বা সামরিক তৎপরতার ছবি তোলা। তাদের উদ্দেশ্য ছিল পারস্য উপসাগরে মার্কিন নৌবাহিনীর একটি বিরাট সামরিক কার্যক্রমের চিত্রধারণ করা।

ইরানী ফ্লাইট সিক্স ফিফটি ফাইভ-এর ওপর সেই ক্ষেপণাস্ত্র হামলার তিনি একজন প্রত্যক্ষদর্শী।

এক বিরল সাক্ষাৎকারে তার সাথে কথা বলেছেন বিবিসির এ্যালেক্স লাস্ট।

পাহোইয়ো বলছিলেন, "পারস্য উপসাগরে পরিস্থিতি ছিল খুবই উত্তেজনাপূর্ণ। ইরান এবং ইরাকের মধ্যে তখন যুদ্ধ চলছে। মার্কিন নৌবাহিনী তখন উপসাগরে কুয়েত থেকে আসা তেলবাহী ট্যাংকারগুলোকে সুরক্ষা দিচ্ছে - যাতে যুক্তরাষ্ট্রে তেলের প্রবাহ অক্ষুণ্ণ থাকে।"

"ইরানীরা তখন সেই সব জাহাজগুলোকে হয়রানি করছিল। এজন্য ইরানীরা স্পিডবোট ব্যবহার করতো। সেগুলো জাহাজগুলোর চারদিক ঘিরে গুলি করতো যাতে জাহাজে আগুন ধরে যায়। কাজেই এটা ঠেকাতে আমাদের ভুমিকা তখন ছিল কিছুটা পুলিশের মতো।"

মার্কিন যুদ্ধজাহাজের সাথে আরো ছিল ব্রিটেন, ইটালি, হল্যান্ড, বেলজিয়াম এবং ফ্রান্সের বিভিন্ন নৌযান।

এসব যান বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে পাহারা দিয়ে উপসাগরের সেই বিপজ্জনক এলাকা পার করে নিয়ে যেতো। কখনো কখনো স্পিডবোটে করে আসা রকেটচালিত গ্রেনেডধারী ইরানী বিপ্লবী গার্ডদের মোকাবিলাও করতে হতো তাদের।

জুলাই মাসের তিন তারিখে রুডি পাহোইয়ো তার ক্যামেরা নিয়ে ইউএসএস ভিনসেন্স-এ উঠলেন - তার উদ্দেশ্য ছিল ওই জাহাজে করে বাহরাইনের একটি বন্দর পর্যন্ত যাওয়া।

এই ইউএসএস ভিনসেন্স ছিল তখনকার দিনে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে আধুনিক সামরিক জাহাজগুলোর অন্যতম।

"বাহরাইনের দিকে যাবার পথে আমরা খবর পেলাম ইরানীদের কিছু স্পিডবোট একটি তেলবাহী ট্যাংকারকে হয়রানি করছে। তখন ইউএসএস ভিনসেন্স থেকে একটি হেলিকপ্টার উড়ে গেল, তারা দেখলো স্পিডবোটগুলো তাদের বন্দরের দিকে ফিরে যাচ্ছে।"  

"আর এই সময়ই হেলিকপ্টারের পাইলট বললো, তাদের লক্ষ্য করে কেউ গুলি ছুঁড়েছে।"

"এ ঘটনাটাই ভিনসেন্সের কমান্ডিং অফিসারের জন্য ওই স্পিডবোটগুলোকে আক্রমণ করার অনুমোদন এনে দিলো।"

১৯৯০এর দশকেই রুডির তোলা ফুটেজ এবং ভিনসেন্সের রেডিও যোগাযোগর বিবরণ মার্কিন নৌবাহিনীর কাছ থেকে হাতে পায় বিবিসি।

"ফুটেজে দূরে স্পিডবোটগুলোকে দেখা যাচ্ছে। জাহাজের এক পাশ থেকে একজন এসে বলছে, আমাদের ওপর গুলি করা হয়েছে। সাথে সাথেই সবাই তাদের যুদ্ধের পোশাক, লাইফ ভেস্ট ও অন্যান্য সরঞ্জাম পরে নিলো, লড়াইয়ের জন্য তৈরি হয়ে গেল।"

মার্কিন সামরিক কমান্ডকে ভিনসেন্স জানালো, তারাও পাল্টা গুলি করতে যাচ্ছে।

উপসাগরে ইরানের বিপ্লবী গার্ডদের স্পিডবোটের সাথে সংঘাতের সময়ই ঘটনাটি ঘটে
ভিনসেন্সের পাঁচ-ইঞ্চি ব্যারেলের কামান থেকে ইরানী গানবোটগুলোর দিকে গোলাবর্ষণ করতে লাগলো।

জাহাজের মাঝখানে একজন অপারেশন্স বিশেষজ্ঞ ছিলেন, তিনি কিছুক্ষণ পর পর লক্ষ্যবস্তুগুলোর অবস্থা সম্পর্কে জানাতে লাগলেন। যখন গানবোটগুলোর ওপর প্রথম আক্রমণ শুরু হলো, তিনি বললেন - সাতটা লক্ষ্যবস্তু, তার পর বললেন, তিনটি লক্ষ্যবস্তু, আরেকটু পর বললেন, আর কোন লক্ষ্যবস্তু নেই।"

"আমরা ভাবলাম, এর পর প্রতিপক্ষ নিশ্চয়ই তাদের যা আছে তাই নিয়ে আবার আক্রমণ করবে - হয়তো আকাশ থেকে হামলা আসবে। কারণ এর আগের বছর - ১৯৮৭ সালে - ইউএসএস স্টার্ক নামে একটি আমেরিকান যুদ্ধজাহাজের ওপর এক্সোস্যাট মিসাইল হামলা হয়েছিল, যা চালিয়েছিল ইরাক। এর পর থেকেই আমরা বলতাম, স্টার্কের কথা মনে রাখবে, সতর্ক থাকবে, নাহলে তুমি মারা পড়তে পারো। আমাদের মনের মধ্যে সব সময় এটা কাজ করতো।"

"পাঁচ মিনিট পার হতে না হতেই, একজন বললো একটা লক্ষ্যবস্তু বন্দর আব্বাস এয়ারপোর্ট থেকে উড়েছে। এই বিমান বন্দরে ইরানি সামরিক বাহিনীর অবস্থান আছে, এবং সামরিক ও বেসামরিক উভয় ধরণের বিমানবন্দর এটি।"

"যে বিমানটা সেখান থেকে উড়লো তাকে চিহ্নিত করা হলো `শত্রু` বিমান বলে। বলা হলো এটি ইরানি বিমান বাহিনীর একটি এফ-১৪ টমক্যাট বিমান। কিন্তু আসলে বিমানটি ছিল এয়ারবাস, ফ্লাইট সিক্স ফাইভ ফাইভ।"

বন্দর আব্বাস থেকে দুবাইয়ের উদ্দেশ্যে সপ্তাহে পাঁচটি ফ্লাইট ওড়ে। তাদের যে ওড়ার পথ - তা ১০ নটিক্যাল মাইল চওড়া। 

"এটা এমন এক মুহুর্ত যখন ক্রুরা আরেকটি লক্ষ্যবস্তুর জন্য অপেক্ষা করছে ঠিক সেই সময় বিমানটি উড়লো।"

"আমি আমার চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছিলাম একটা যুদ্ধের পরিস্থিতি কেমন হয় - একটা তীব্র উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশে নানা ঘটনা ঘটছে, আর তার মধ্যে কিভাবে বিভ্রান্তি তৈরি হলো। কিভাবে তারা লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিত করতে ভুল করলো।"

ইউএসএস ভিনসেন্স মার্কিন কমান্ডকে জানালো যে, বিমানটি যদি ২০ নটিক্যাল মাইলে মধ্যে চলে আসে এবং দিক পরিবর্তন না করে, তাহলে সেটাকে গুলি করে নামানো হবে।

ভিনসেন্স থেকে বিমানটির উদ্দেশ্যে সতর্কবার্তা পাঠানো হলো।

এটা নিশ্চিত জানা যায় না যে যাত্রীবাহী বিমানটি ভিনসেন্স থেকে পাঠানো সতর্কবার্তা শুনতে পেয়েছিল কিনা। বিমানটি তখন কয়েক হাজার ফুট ওপরে, এবং তা তার নিজ পথেই দুবাইয়ের উদ্দেশ্যে উড়তে থাকলো।

"আমি একজন লেফটেন্যান্টের কাছে গেলাম জিজ্ঞেস করলাম, একটা তোমরা কি করতে যাচ্ছো? সে বললো, তুমি এখন একটা ক্ষেপণাস্ত্র অপারেশন দেখতে পাবে।"

ইউএসএস ভিনসেন্স থেকে প্রচন্ড শব্দে একটা মিসাইল নিক্ষেপ করা হলো - সেটা তীব্র গতিতে উড়ে গেল বিমানটির দিকে।

আমি অপারেশন স্পেশালিস্টে কাছে গেলাম। দেখলাম, সে উড়ন্ত মিসাইলটির দিকে তাকিয়ে আছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেটা আকাশে বিমানটিকে আঘাত করলো।

নৌ-সেনাদের উল্লসিত কণ্ঠ শুনতে পেলাম। কিন্তু জাহাজে অন্য পাশ থেকে একজন লেফটেন্যান্ট বললো, বিধ্বস্ত বিমানটির যে টুকরোগুলো সাগরে পড়ছে সেগুলো এতে বড় বড় যে তা এফ-১৪ টমক্যাটের হতে পারে না।

এর পর ১৫-২০ মিনিটের মধ্যেই জানা গেল যে একটি যাত্রীবাহী বিমান নিখোঁজ হয়েছে।

রেডিওতে ঘোষণা এলো `একটি ইরানী এয়ারবাস সম্ভবত: বিধ্বস্ত হয়েছে, দয়া করে খোঁজ করুন কেউ বেঁচে আছে কিনা বা ধ্বংসাবশেষ দেখা যাচ্ছে কিনা।`

ইউএসএস ভিনসেন্সের ভাবটা ছিল: যাত্রীবাহী বিমান নিখোঁজ? আমরা তো কোন যাত্রীবাহী বিমান লক্ষ্য করে গুলি করিনি। আমাদের লক্ষ্যবস্তু ছিল টমক্যাট।

সাগরের এক বিরাট এলাকা জুড়ে বিধ্বস্ত বিমানটির ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে ছিল। কাউকে জীবিত পাওয়া গেল না। পানি থেকে উদ্ধার করা হলো শুধুই মৃতদেহ। বোঝা গেল বিমানের ২৯০ জন আরোহীর সবাই নিহত হয়েছে।

"এটা নিয়ে অনেক অনুতাপ হয়েছে। আমি দেখেছি তারা মাথা নিচু করে আছে, কেউ বা রেলিংএ ভর দিয়ে উদাস হয়ে তাকিয়ে আছে। কয়েকজন নিজেদের মধ্যে কথা বলেছে। তাদের শরীরের ভাষা থেকেই আপনি বুঝতে পারতেন যে তারা মর্মাহত। যা ঘটেছে তা যেন তারা বিশ্বাস করতে পারছে না। নাবিকরা আমার সাথে কথা বলতে চাইছিল না। কমান্ডিং অফিসার একটা মিটিং করলেন ক্রুদের নিয়ে। আমাকে বলা হলো আমি যেন ক্যামেরা ব্যাগ থেকে না বের করি।"

পেন্টাগন থেকে চেষ্ট করা হলো ইরানীদের ওপর দোষ চাপানোর। বলা হলো ইরানী যাত্রীবাহী বিমানটি এমন আচরণ করেছে যাতে তাদের বৈরি বলে মনে হয়েছিল।

বিবৃতিতে বলা হলো, "মার্কিন সরকার এ ঘটনার জন্য গভীরভাবে দু:খিত। এর পূর্ণ তদন্ত করা হবে। তবে এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী মনে হচ্ছে যে স্থানীয় কমান্ডারদের এটা মনে করার যথেষ্ট কারণ ছিল যে তারা বিপদের সম্মুখীন এবং আত্মরক্ষার জন্যই তারা গুলি করেছে। ইরানের বিমান বন্দর থেকে একটি বিমান উড়েছে, উচ্চ গতিতে ভিনসেন্সের দিকে মোড় নিয়েছে, দিক পরিবর্তন করে নি, উচ্চতা কমে যাচ্ছে, যোগাযোগ করছে না, যুক্তিসংগত ভাবেই এটাকে বিপদের কারণ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।"

কিন্তু অনেক দিন পর এই একই ঘটনার এক সম্পূর্ণ ভিন্ন বিবরণ সামনে এসেছিল।

নৌবাহিনীর তদন্তকারীদের একটি ফাঁস-হওয়া রিপোর্টে যা দেখা গেছে - তার সাথে পেন্টাগণ সেই গুলিবর্ষণের ঘটনার দিন যা বলেছিল - তার অনেক গরমিল রয়েছে।

ওই রেকর্ডপত্রে দেখা যায়, বিমানটি যুদ্ধবিমানের চাইতে অনেক ধীর গতিতে উড়ছিল, এবং আক্রমণ করতে যেভাবে নিচের দিকে নামতে হয় তা মোটেও করছিল না, বরং তা ওপর দিকে উঠছিল।

বিমানটিকে বৈরি বলে চিহ্নিত করে রাডার অপারেটর স্পষ্টতই ভুল করেছে। অন্য একটি ইরানী পরিবহন বিমানের সিগন্যালকে ক্রুরা মনে করেছিল যে সেটা যাত্রীবাহী বিমান থেকে আসছে। ক্যাপ্টেনকে এসব ভুল তথ্য দেবার পরিণতিতেই একটি ভুল সিদ্ধান্ত এবং গুলি করার আদেশ এসেছিল।

এ ঘটনার পরেও ভিনসেন্সের ক্যাপ্টেনকে তার আচরণের জন্য পুরস্কৃত করা হয়। রুডি পাহোইয়ো পরে নৌবাহিনীর চাকরি ছেড়ে দেন। পরে তিনি ক্যামেরা অপারেটর হিসেবেই লস এঞ্জেলেসে কাজ করেছেন।

"ওই ঘটনায় ৬৬টি শিশু সহ ২৯০ জন নিহত হয়। সেই পরিবারগুলো - যারা প্রিয়জনদের হারিয়েছেন - তাদের জন্য আমার কষ্ট হয়।"

"কোন কোন সময় নিজেকে ইতিহাসের সাক্ষী ভেবে ভালো লাগে, কোন কোন সময় আবার এ জন্য খারাপ লাগে। আমি চাইনি যে এ রকম কিছু ঘটুক। কিন্তু আমার সামনেই এটা ঘটেছিল।"

এসি  

  

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি