প্রাইমারিতে সুপারিশপ্রাপ্ত শিক্ষকরদের নিয়োগ ঝুলে আছে
সরকারি চাকরি পেয়েও বেকার তারা: নিরানন্দ ঈদ ১৪ হাজার পরিবারের
প্রকাশিত : ১২:২৩, ২৫ মে ২০২৬ | আপডেট: ১২:২৪, ২৫ মে ২০২৬
দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে চলমান বেহাল দশা যেন কাটছেই না। দীর্ঘদিন ধরে চলছে চরম শিক্ষক সংকট। সারেজমিনে বিভিন্ন বিদ্যালয় ঘুরে দেখা যায় শিক্ষকের অভাবে পাঠদান থমকে আছে। এরই মধ্যে নব নিয়োগের জন্য চুড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্ত সাড়ে ১৪ হাজার শিক্ষকের চুড়ান্ত নিয়োগ ও যোগদান অজানা কারণে ঝুলে আছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শেষ সময়ে শুরু হওয়া প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক নিয়োগ-২০২৫-এর কার্যক্রম ৩ মাসের অধিক সময় ধরে এখনো শেষ ধাপে আটকে আছে। গত ফেব্রুয়ারির ৮ তারিখে চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পরও এখনো নিয়োগপত্র পাননি ১৪ হাজার ৩৮৪ জন সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থী। ফলে একদিকে যেমন ব্যাহত হচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম, যোগ্য শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে যেতে পারছেন না, অন্যদিকে অনিশ্চয়তা, মানসিক চাপ ও আর্থিক সংকটে দিন কাটাচ্ছেন নয়োগের সুপারিশপ্রাপ্ত এসব হাজারো মেধাবী তরুণ-তরুণীর।
জানা যাচ্ছে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সংকট দূর করতে ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। দেশের ৬১ জেলা থেকে ৮ লাখের বেশি চাকরিপ্রার্থী লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেন। পরবর্তীতে প্রায় ৬৯ হাজার প্রার্থী মৌখিক পরীক্ষার জন্য নির্বাচিত হন এবং প্রশাসনিক যাচাই-বাছাই শেষে মেধার ভিত্তিতে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হন ১৪ হাজার ৩৮৪ জন।
২০২৬ সালের জানুয়ারির ৯ তারিখে লিখিত পরীক্ষার পর পরীক্ষায় অনিয়মের কিছু অভিযোগ উঠলে কতৃপক্ষ গোয়েন্দাসংস্থা ও প্রশাসনের সর্বোচ্চ সতর্কতামূলক অবস্থার কথা উল্লেখ করে প্রশ্নফাঁস ও অনিয়ম হয়নি মর্মে ১১ জানিয়ারি তারিখে প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানায়। অধিকতর স্বচ্ছতার নিমিত্তে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পক্ষ হতে ১১ জানুয়ারির পর পুনরায় গোয়েন্দাসংস্থার কাছে অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করতে নথি পাঠানো হয় এবং অনিয়মের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি মর্মে ২১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।
এদিকে এবারের নিয়োগ ছিলো সংশ্লিষ্ট কোটামুক্ত প্রথম প্রাথমিক নিয়োগ পরীক্ষা। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, এবারের সুপারিশপ্রাপ্তদের বড় একটি অংশ দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেছেন। দীর্ঘ প্রস্তুতি ও প্রতিযোগিতামূলক নিয়োগ প্রক্রিয়া পেরিয়ে তারা নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করেন। গোয়েন্দা সংস্থা ও প্রশাসনিক ভেরিফিকেশনও ইতিবাচকভাবে সম্পন্ন হয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পরও দীর্ঘদিন ধরে থমকে আছে নিয়োগপত্র প্রদান ও যোগদান কার্যক্রম।ফলে সুপারিশপ্রাপ্তরা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে সময় পার করছেন। অনেক প্রার্থীর পরিবারে এই চাকরিকে ঘিরে নতুন স্বপ্ন তৈরি হয়েছিল। কেউ অন্য চাকরির সুযোগ ছেড়েছেন, কেউ কোচিং বা টিউশনি বন্ধ করে বাড়ি ফিরেছেন। কিন্তু যোগদান বিলম্বিত হওয়ায় অনেকেই এখন আর্থিক সংকটে পড়েছেন।
যোগদান কার্যক্রম স্বাভাবিক ভাবে চললে গত ঈদ-উল-ফিতরের আগেই তারা যোগদান করে পরিবার নিয়ে ইদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে পারতেন। কিন্তু যোগদান ঝুলে থাকায় তারা আসছে ঈদ-উল-আযহার বেতন বোনাস বঞ্চিত হচ্ছে এবং পরিবার নিয়ে চরম হতাশায় ও অর্থকষ্টে দিনাতিপাত করছেন।
একজন সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন, ‘চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পর ভেবেছিলাম দ্রুত যোগদান হবে। কিন্তু মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে করতে এখন পরিবার চালানোই কঠিন হয়ে গেছে।’
এদিকে দেশের বহু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এখনো তীব্র শিক্ষক সংকট বিরাজ করছে। কোথাও একজন শিক্ষক দিয়ে একাধিক শ্রেণির পাঠদান চলছে, আবার কোথাও দীর্ঘদিন ধরে শূন্য পদ পূরণ না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষক স্বল্পতার কারণে নিয়মিত ক্লাস কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশুদের মৌলিক শিক্ষা। বিশেষ করে বাংলা, গণিত ও ইংরেজির মতো বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা বাড়ছে বলে অভিযোগ অভিভাবকদের।
ইতোপূর্বে একুশে টেলিভিশনের সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানিয়েছিলেন, দ্রুত যোগদান প্রকৃয়া সম্পন্ন হবে। তারপর কার্যক্রমে কিছুটা গতি পেলেও আবার অজানা কারণে সব যেন মুখ থুবড়ে পড়েছে।
এদিকে আরেকটি সুত্র জানাচ্ছে চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ এসব প্রার্থীদের আবারও অজানা কোন পদ্ধতির পরীক্ষায় বসতে হবে। এজন্য একটি মূল্যায় পদ্ধতি ঠিক করা হচ্ছে। এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেই যোগদানের সুযোগ মিলবে বলে জানা গেছে। সূত্র জানিয়েছে, ১৪ হাজারের বেশি শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, মূল্যায়ন মডিউল তৈরি করা হচ্ছে। এটি তৈরির কাজ প্রায় শেষ। পিটিআইএর মাধ্যমে প্রশিক্ষণ হওয়ার সম্ভাবনা জোরালো।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, প্রাথমিক শিক্ষকদের নিয়োগ নিয়ে অযাচিত ধোঁয়াশা সৃষ্টি করা হচ্ছে। জেনারেল ফাইন্যান্সিয়াল রুলস ও অন্যান্য সরকারি আইন ও বিধি অনুসারে কোন চাকরিপ্রার্থীকে চাকরিতে নিয়োগপত্র ইস্যু না করে সরকারি অর্থে ২ মাস, ৪ মাস কিংবা যেকোনো সময়ের জন্য সরকারি অর্থ খরচ করে প্রশিক্ষণের সুযোগ নেই। সরকারি চাকরির নিয়ম অনুসারে প্রার্থীকে শিক্ষানবীসকালের জন্য নিয়োগপত্র ইস্যু করা হয়। তারপর তাদের বুনিয়াদি কিংবা বিভাগীয় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ধাপে ধাপে মূল্যায়ন করা হয়। কেউ তখন মূল্যায়নে অযোগ্য বলে প্রমাণিত হলে চাকরি স্থায়ীকরণ বন্ধ রাখা হয়। কিন্তু যোগদান না করিয়ে সরকারি চাকরির সুপারিশপ্রাপ্তদের লম্বা প্রশিক্ষণের কোনো রীতি বা রেওয়াজ নেই বলে বিশেষজ্ঞরা মত দেন।
এমতাবস্থায় শিক্ষা ব্যবস্থার স্বার্থে, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের স্বার্থে এবং হাজারো মেধাবী তরুণ-তরুণীর জীবনে অনিশ্চয়তা দূর করতে দ্রুত কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়ার দাবি জোরালো হচ্ছে সর্বমহলে।
আরও পড়ুন










