ঢাকা, বুধবার   ১৯ জানুয়ারি ২০২২, || মাঘ ৬ ১৪২৮

করোনায় স্থবির মৌলভীবাজারের পর্যটন শিল্প

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি

প্রকাশিত : ১৭:৪৭, ২৮ জুন ২০২০

বৈশ্বিক করোনা মহামারির প্রভাব পড়েছে মৌলভীবাজারের পর্যটন কেন্দ্রগুলোতেও। প্রায় তিন মাসেরও অধিক সময় ধরে বন্ধ রাখায় জেলার এ খাতে বড় ধরনের ধস নেমেছে। একই সাথে বন্ধ রয়েছে এ জেলার সকল হোটেল রিসোর্টও।

লাউয়াছড়া বন, চা বাগান, আনারস বাগান, হাওর, বাইক্কাবিল, মাধবপুর লেক, হামহাম, সদ্য আবিষ্কৃত নেনো স্লট গিরিখাত, পান, আদিবাসীদের জীবন ও তাদের হস্তশিল্প, বর্ষিজোড়া ইকো পার্ক, মাধবকুন্ড জলপ্রপাতের মতো প্রায় দেড়শ পর্যটন কেন্দ্রে সারা বছরই মুখরিত থাকতো পর্যটকে। আজ তাতে সুনসান নিরবতা।

এ ব্যাপারে জেলার শ্রীমঙ্গল পর্যটন সেবা সংস্থার আহ্বায়ক আবু সিদ্দিক মো. মুছা জানান, ‘চলতি বছরের ২৬ মার্চ থেকে দেশে লকডাউন ঘোষণা হলেও মৌলভীবাজার জেলায় ১৮ মার্চ থেকেই বন্ধ হয়ে যায় হোটেল রিসোর্টগুলো। কাছাকাছি সময়ে বন্ধ হয়ে যায় খাবার হোটেলগুলো। এ অবস্থায় প্রায় ৩ মাস ধরে বন্ধ থাকায় কোটি কোটি টাকা লোকসানে পড়েছেন এ জেলার পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।’

তিনি জানান, ‘জেলায় সরকারি-বেসরকারি প্রায় দেড় শতাধিক হোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি শ্রীমঙ্গল উপজেলায়। এ জেলায় রয়েছে প্রায় দেড়শর মতো পর্যটনকেন্দ্র। যা সারা বছরই ভরে থাকতো ভ্রমণ পিপাসুদের আনাগোনায়। যার উপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল কয়েক লাখ মানুষ। কার্যত এই মানুষগুলো এখন বেকার অবস্থায়।’

পর্যটন সংশ্লিষ্ট আরেক ব্যবসায়ী এসকে দাশ সুমন বলেন, ‘পর্যটনের সাথে শুধু হোটেল রিসোর্ট নয় এর সাথে সম্পৃক্ত রয়েছে শ্রীমঙ্গলের বেশ কিছু কৃষিজ পণ্য। আর এই সময়ে এসব পণ্যের উৎপাদনকারীরাও বিপাকে পড়েছেন। পর্যটকরা শ্রীমঙ্গলে আসলে লেবু, আনারস, চা ও মনিপুরী শাড়ীসহ হাতের তৈরি বিভিন্ন জিনিসপত্রও নিয়ে যান।’

এদিকে বিপাকে পড়েছেন এ জেলার ট্যুর গাইডরা। শ্রীমঙ্গল ট্যুর গাইড এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক তাপস দাশ জানান, ‘মৌলভীবাজার জেলায় প্রায় ৭০ জনের মতো ট্যুর গাইড রয়েছেন। এদের মধ্যে প্রায় ৫০ জন এর উপরই নির্ভরশীল। গত তিন মাস ধরে তারা খুবই কষ্টে দিনানিপাত করছেন। সরকারিভাবে বিভিন্ন সংগঠনকে সাহায্য করা হলেও ট্যুর গাইডদের কোন সহায়তা করা হয়নি।’ 

এদিকে এ জেলায় রয়েছে নামিদামী পাঁচ তারকা মানের হোটেলসহ বেশ কয়েকটি বড় বড় হোটেল-রিসোর্ট, কটেজ ও গেষ্ট হাউজ। যার এক একটিতে একশ থেকে চারশ পর্যন্ত লোক কাজ করেন। 

এ ব্যাপারে শ্রীমঙ্গল গ্রান্ড সুলতান টি-রিসোর্ট এন্ড গল্ফের সহকারী ব্যবস্থাপক শাহ আরিফ আলী নাসিম জানান, ‘তাদের প্রতিষ্ঠানে প্রায় চারশ লোক কাজ করেন। বর্তমানে আয় শূন্যের কোটায়, তারপরও প্রত্যেকেরই বেতন ভাতা অব্যাহত রয়েছে।’ 

একই কথা জানান শ্রীমঙ্গল গ্রান্ড সেলিম হোটেল এন্ড রির্সোটের পরিচালক সেলিম আহমদ। তিনি জানান, ‘তাদের অনেকেই ব্যাংক লোন নিয়ে এ ব্যবসা করছেন। এ অবস্থায় তারা দিশেহারা। সরকারের প্রণোদনা না পেলে অনেক রিসোর্ট মালিককে ব্যবসা বন্ধ করে দিতে হবে।’

শ্রীমঙ্গল লেমন গার্ডেন রির্সোটের স্বত্বাধিকারী মো. সেলিম মিয়া জানান, ‘বহু টাকা ব্যয় করে অনেকেই এ প্রতিষ্ঠান গড়েছেন। যার অধিকাংশই ব্যাংক লোন নিয়ে। গত তিন মাস ধরে প্রায় দুই শতাধিক লোককে বেতন ভাতা দিয়ে আসছি।’

এ ব্যাপারে শ্রীমঙ্গলের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মো. জাহাঙ্গী আলম সোহাগ মিয়া জানান, ‘শ্রীমঙ্গলের অধিকাংশ ব্যবসায়ীই পর্যটন নির্ভর। এখানে সবগুলো খাবার হোটেল বন্ধ রয়েছে। বন্ধ রয়েছে মিষ্টির দোকান থেকে শুরু করে ছোট ছোট পানের দোকান পর্যন্ত। যার মূল কাস্টমার পর্যটক। এই হোটেল ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ত রয়েছেন মুরগী, মাংস, মাছ, চাল ব্যবসায়ী। এমন অবস্থায় মুদির দোকানিসহ আরও অনেক ধরণের ব্যবসায়ী, যারা সবাই ক্ষতিগস্ত। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সরকারের প্রণোদনার আওতায় আনার দাবি জানাই।’

আর শ্রীমঙ্গল পরিবহন শ্রমিক নেতা ময়না মিয়া ও  শাহজানা আহমদ জানান, ‘এ জেলায় পর্যটকদের উপর নির্ভর করে জীবন চলে বহু কার লাইট্রেস ও জীপসহ অনান্য যানবাহন চালকের। করোনায় লকডাউনে এতদিন যান চলাচল বন্ধ ছিল। আর এখন কিছুটা শিথিল হলেও পর্যটক না আসায় তাদের অবস্থা এখনও খারাপ।’

এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক নাজিয়া শিরিন  জানান, ‘মৌলভীবাজার একটি পর্যটন জেলা। এখানে এ খাতের নির্ভর লোকের সংখ্যা বেশি। অবস্থা বিবেচনায় ছোট ছোট ব্যবসায়ীদের খাদ্য সহায়তা করা হয়েছে। তবে লকডাউনের কারণে ক্ষতির মুখে পড়া  পর্যটন সংশ্লিষ্টদের বিষয়টি তিনি সরকারের ঊর্ধ্বতন দপ্তরে অবহিত করবেন।’

এআই//


Ekushey Television Ltd.

© ২০২২ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি