ঢাকা, শনিবার   ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, || আশ্বিন ১০ ১৪২৮

ট্রেকিংয়ে হাতেখড়ি

সালেহীন আরশাদী

প্রকাশিত : ১০:২৩, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১

প্রফুল্লতা ও আনন্দের সাথে সাথে নিজের জীবন ও কর্মের প্রতিফলন দেখার জন্য পাহাড়ের চাইতে উপযুক্ত জায়গা বোধ হয় কমই আছে। পাহাড়ে পথ চলতে চলতে আমি বিশ্বাস করতে শিখেছি সৃষ্টির সৌন্দর্যকে উদযাপন ও জীবনকে অর্থবহ করে গড়ে তুলতে ট্রেকিংয়ের বিকল্প কিছু নাই। ট্রেকিং মানুষের জন্য চমৎকার শিক্ষকের মতো কাজ করতে পারে। জীবনের দৈনন্দিন শৃঙ্খলে বন্দী থেকে থেকে ক্লান্ত শরীর ও মনকে সজীব ও উজ্জীবিত করতে ট্রেকিং টনিকের মতো কাজ করে। প্রকৃতিতে টিকে থাকার জন্য জীবন রক্ষাকারী অপরিহার্য কিছু কৌশল শেখায়। মনযোগী করে তোলে, আমাদের অনুভূতি শক্তি বৃদ্ধি করে, আত্মবিশ্বাস বাড়ায়।

অন্যদিকে প্রকৃতি মানুষকে বিনয়ী হতে শেখায়, অহম দমনে সাহায্য করে। প্রকৃতির প্রভাবে মানুষের অনুভূতিগুলো আরও বেশী সুক্ষ্ম ও প্রখর হয়ে ওঠে। প্রকৃতিতে গিয়ে এক সময় সে এমন সত্য উপলব্ধি করে যাতে নিজের ভোগ, বিলাস, লালসা ভুলে গিয়ে আশেপাশের সমস্ত প্রতিবেশের প্রতি সে সচেতন ও বিবেচক হয়ে ওঠে। যারা নিয়মিত প্রকৃতির কাছাকাছি থাকেন ও ট্রেকিংকে গভীরতার সাথে নিয়মিত চর্চা ও অনুশীলন করেন তারা ধীরে ধীরে সমাজের জন্য মূল্যবান সম্পদে পরিণত হতে পারেন।

ট্রেকিং আমাদের ক্ষয়িষ্ণু সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পালটে দিতে পারে। তাই পাহাড়ের রহস্যময় সেই অভিজ্ঞতার স্বাদ নেবার জন্য সবাইকে অনুপ্রাণিত করা উচিত। সবাই যেন এই জীবনবোধ উপভোগ করতে পারে, তাই টিওবি থেকে আমরা পাহাড়ে যাবার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সকলের জন্য সরবরাহ করে গেছি। পাহাড়ে যাবার ব্যাপারে সকল জড়তা, ভীতি দূর করতে সচেষ্ট হয়েছি। আমাদের চাওয়া ছিল সবাই যেন এই জীবনবোধটিকে আত্মস্থ করতে পারে ও পাহাড়ের চমৎকার অভিজ্ঞতাগুলোকে প্রত্যহ জীবনে কাজে লাগাতে পারে।

আমাদের এই দর্শনগত মুদ্রার যে অন্য আরেকটি দিকও আছে, অনেকদিন পর্যন্ত আমরা সেটি উপলব্ধি করতে পারিনি। কিন্তু কিছু সময় যাবার পর আমরা অনেক বড় রকমের একটি ধাক্কা খেয়েছি। আমরা হতবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম- উন্মুক্ত তথ্য প্রবাহের সুযোগে আমাদের শহুরে অসুস্থতা অকৃত্রিম পাহাড়েও ছড়িয়ে পড়ছে। আমরা ধরেই নিয়েছিলাম প্রকৃতির কাছাকাছি যারা যেতে চায়, যাদের আগ্রহ আছে তাদের ভাবনাগুলো বোধ হয় আমাদের মতোই হবে। আমরা ধরেই নিয়েছিলাম, পাহাড়ে যারা যেতে চায়, যাদের যাবার প্রচন্ড আগ্রহ আছে তারা তো জানবেই পাহাড়ে গিয়ে কেমন আচরণ করতে হয়। আমরা নিশ্চিত ছিলাম, কেউ যখন পাহাড়ে যাবার জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠে তখন সে মানব কোলাহল ও কৃত্রিম আলোর ঝনঝনানি থেকে অনেক দূরে ঘন অরণ্যের সজীব ঘ্রাণ ও নিরবতার খোঁজেই পথে নামে।

অনেক দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে লক্ষ্য করলাম যত দিন যাচ্ছে ততই পরিবেশের প্রশান্তি সম্পর্কে বিন্দুমাত্র আগ্রহ না থাকা, হৈচৈ, ফুর্তি, ইচ্ছেমত আবর্জনা ফেলে আসা, স্থানীয়দের সাথে বাজে আচরণ  করা, ঐতিহ্য সংস্কৃতি মূল্যবোধের তোয়াক্কা না করাদের কাছে আমাদের দর্শনটি কোনঠাসা হয়ে যাচ্ছে। এই অসুস্থ চিন্তার স্রোত অতিক্রম করে আমরা কিছুতেই আমাদের দর্শন ও মূল্যবোধগুলো ছড়িয়ে দিতে পারছিলাম না। অনেকেই এই অবস্থার জন্য পুরোপুরি টিওবির ওপর দায় চাপিয়ে দিয়েছে, আমরা নিজেরাও এই অবস্থার জন্য দুঃখিত হয়েছি, অনুশোচনা করেছি। কিন্তু একই সাথে সাথে উপলব্ধি করেছি এই সমস্যা টিওবি বা তার দর্শনের জন্য ঘটেনি, টিওবির অস্তিত্ব না থাকলেও আজ হোক বা কাল এইদিন আমাদের দেখতেই হতো। মূল সমস্যার দিকে দৃষ্টিপাত করতে হলে আমাদের আরও গভীরে উঁকি দিতে হবে, কারণ  জাতিগত ভাবেই আমরা অপরিচ্ছন্ন ও পারিপার্শ্বিক বিষয়ে অনুভূতিশুন্য। এটি আমাদের জাতিগত সমস্যা। 

একটু খেয়াল করে দেখুন, প্রকৃতি সংরক্ষণের জন্য যা কিছু বলা হচ্ছে, যেমন- হৈচৈ করা যাবে না, বুনো পরিবেশ নষ্ট করা যাবে না, যত্রতত্র ময়লা আবর্জনা ফেলা ও মলমূত্র ত্যাগ করা যাবে না, গাছের গায়ে বা পাথরের গায়ে নাম ধাম লিখা যাবে না...একজন মানুষ হিসেবে কিন্তু এগুলো সবই আমাদের খুবই সাধারণ সামাজিক দায়িত্ব ও কর্তব্য। পাহাড়ে যাবার কথা আপাতত বাদ দিলাম, আমরা যারা শহরে বাস করছি তারা কি এই সামাজিক দায়িত্বগুলো ঠিকঠাকভাবে পালন করছি? সমাজের এই সাধারণ শিক্ষাগুলো আমাদের পাবার কথা পরিবার থেকে। এরপর স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য জাতিগতভাবেই আমরা এখনও সামাজিকভাবে শিক্ষিত হয়ে উঠতে পারিনি। তাই তো এখনও আমরা নিজেদের দোরগোড়ার সামনেই আবর্জনা ফেলে দেই, পরিচ্ছন্ন কোনও দেয়াল পেলেই সেখানে পোস্টার সেঁটে দেই, চিকা মেরে দেই। 

এবার আমাদের শিক্ষা সফরগুলোর স্মৃতি রোমন্থন করে দেখুন তো। কি করেছি আমরা আমাদের শিক্ষা সফরগুলোতে? বাসের ছাদের ইয়া বড় সাউন্ড সিস্টেম লাগিয়ে অস্বাভাবিক জোরে গান চালিয়ে নেচে গেয়ে রাস্তার সবাইকে জানতে বাধ্য করেছি যে আমরা দল বেঁধে শিক্ষা সফরে বের হয়েছি। তখন আমাদের একবারও মনে হয়নি আমাদের আনন্দ ফুর্তি অন্যকে বিরক্ত করছে। সকালের নাস্তায় খাওয়া কলার খোসা অবলীলায় বাসের জানালা দিয়ে রাস্তায় ফেলে দিয়েছি। একবারও মনে হয়নি এই কাজটি খারাপ হচ্ছে; আমি রাস্তাটি ময়লা করছি বা এই খোসার কারণে অন্য কারও দূর্ঘটনা হতে পারে। কেউ তখন ভুল ধরিয়ে দিয়ে শুধরে দেয় নি। এক সময় আমাদের এইসব কাজ কারবারই হয়ে স্বাভাবিক। এটাই হয়ে গেছে আমাদের জাতিগত আনন্দ উৎসব চিত্তবিনোদনের সংস্কৃতি। ভ্রমণ আমাদের জন্য হয়ে গেছে শুধুমাত্র প্রমোদের উদ্দেশ্য, আনন্দ ফুর্তির একটি মাধ্যম মাত্র। ঈদের সময় পাড়া মহল্লায় বা লঞ্চে করে নদীগুলোতে আমাদের সেই শিক্ষা সফরগুলোর মত একইভাবে আমরা উদ্দামভাবে আনন্দ উদযাপন করে থাকি। জাতিগতভাবেই যদি আমাদের চিত্তবিনোদনের সংস্কৃতি এমন উশৃঙ্খল হয় তাহলে আমরা কিভাবে আশা করতে পারি, পাহড়ে গিয়ে আমরা সবাই বিবেচকের মত আচরন করব?
    
আমরা আমাদের এই জাতিগত বৈশিষ্ট্যকে অস্বীকার করতে পারি না। একই সাথে এই বিষয়টির দায় আমরা অস্বীকারও করতে পারি না। বরং এখন যেহেতু রোগ নির্ণয় করা গেছে আমরা আরও উজ্জ্বীবিত হয়ে এই রোগ সারানোর কাজে উঠে পড়ে লাগতে পারি। আমাদের জন্য এটি এখন বাস্তবিক অর্থেই একটি সামাজিক বিপ্লবে রুপ নিয়েছে। মানুষ হিসেবে সাধারণ মূল্যবোধগুলো জাগ্রত করার জন্য, জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই বিষয়কে বিস্তর লিখালিখা করা হচ্ছে, ভ্রমণ পিপাসু ও স্থানীয়দের ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে নানাভাবে অবহিত করা হচ্ছে,  স্পর্শকাতর ও ক্ষতিগ্রস্থ স্থানগুলোতে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। 

এই চলমান আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ট্রেকিংয়ে হাতেখড়ি বইটি প্রকাশের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বইটিতে ট্রেকিংয়ের খুবই মৌলিক ও  প্রাথমিক কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছি। আজকাল ইন্টারনেটে এই বিষয়ক তথ্যের কোন অভাব নেই। সার্চ ইঞ্জিনের ক্লিক করলেই অগনিত তথ্যে স্ক্রিন ভরে যায়। তারপরেও আমাদের ভাষায় আমাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা নির্ভর একটি বই থাকলে মন্দ হত না এমনটা চিন্তা করেই বইটি লিখার দুঃসাহস করে ফেলেছি।

কি আছে এই বইতে আর কাদের জন্য লিখা হয়েছে? 
এই বইটিতে ট্রেকিং কি, কিভাবে শুরু করা যায়, কি কি জিনিস লাগে, ট্রেকিংয়ের জন্য কি কি ব্যাপার মাথায় থাকা লাগে, ট্রেকিংয়ের এথিক্স ও এটিকেট কি কি, কেনই বা এসব গুরুত্বপূর্ণ আর বেশ কিছু টিপস ও ট্রিক্স। 

অনেকেই হয়ত ভেবে নিয়েছেন বইটিতে আমার ট্রেকিংয়ের গল্প আছে। তাদের জন্য আমি খুবই দুঃখিত। আমি ভেবে রেখেছিলাম যদি কখনও আমার পাহাড়ের অভিজ্ঞতাগুলো বই হিসেবে নিয়ে আসি তাহলে তার আগে অবশ্যই ট্রেকিং শুরুর বেসিক একটি গাইডলাইন নিয়ে আসব। কারণ আমার মনে হয়েছে- সবার আগেই এমনই বই-ই বেশী দরকার। নতুন প্রজন্মের ট্রেকারদের পথ দেখানোর জন্য, আমরা যে যে ভুল করেছি, ভুল থেকে যা কিছু শিখেছি নতুনদের যদি আগেই সেগুলো জানানোর ব্যবস্থা করা যায় তাহলে তারা অটোমেটিক্যালি অনেকদূর এগিয়ে যাবে। আমরা পথচলা যেখানে শেষ হয়েছে তারা সেখান থেকে আরও সামনের পথে এগিয়ে যেতে পারবে।
 
নতুন নতুন যারা পাহাড়ে যাওয়া শুরু করেছেন তাদের জন্য এই বইটি পড়ে নিলে খুবই উপকার হবে বলে আমি মনে করি। পাহাড়, পর্বত, ট্রেকিং সম্পর্কে অনেক ধারণা স্পষ্ট হবে। এই বইতে যেই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে তার সব কয়টা বিষয়ই ট্রেক উপভোগ করার জন্য খুব ভাইটাল। ট্রেককে শুধু আনন্দময় করার জন্য নয় একইসাথে কিভাবে আমরা প্রকৃতির উপর আমাদের ক্ষতিকর প্রভাবগুলো কমিয়ে আনতে পারি সেই বিষয়গুলোও আলোচনা করা হয়েছে। এই বইটি আসলে লিখা হয়েছে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের তরুণ-তরুণীদের কথা চিন্তা করে। যেন তারা চাইলেই এই ট্রেকিং বিষয়ে পথ দেখানোর জন্য বাংলা ভাষায় এই বইটি হাতের নাগালে পেতে পারে। 

একইসঙ্গে যারা এখন নিয়মিত ট্রেক করেন তারাও এই বইটি পড়ে উপকৃত হবেন, কিছু না কিছু নতুন শিখবেন এই কথা আমি জোর দিয়ে বলতে পারি। আমার বন্ধু তালিকায় যারা কমার্সিয়াল ট্রিপ পরিচালনা করেন তারা ট্রেকিং ক্লায়েন্টদের এই বইটি সাজেস্ট করতে পারেন। বিভিন্ন এডভেঞ্চার ক্লাবগুলো তার নবীন সদস্যদের বইটি সাজেস্ট করতে পারেন। বান্দরবান থেকে হিমালয়- সব ধরণের ট্রেকের প্রাথমিক প্রস্তুতির জন্য এই বইটি কাজে লাগবে বলে আমার বিশ্বাস।

বইটি কোথায় কোথায় পাবেন: 
[১] পিক সিক্সটি নাইন 
লেভেল-২, বসুন্ধরা সিটি 
[২] অল্টিটিউড হান্টার 
সাহেরা ট্রপিকাল সেন্টার, ৬ষ্ঠ তলা 
 [৩] আউটডোর বিডি
১৬৮/১ খান প্লাজা, দক্ষিণ কমলাপুর, ঢাকা-১২১৭

এনএস/


Ekushey Television Ltd.

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি