রংপুরে ৪ খুনের জবানবন্দি দিলেন সীমান্ত, আসামিদের বক্তব্যের সঙ্গে মিলেছে বর্ণনা
প্রকাশিত : ০৮:৫৬, ২৬ আগস্ট ২০২৬ | আপডেট: ০৯:২৩, ২৬ আগস্ট ২০২৬
রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক, তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার মামলায় সাক্ষী হিসেবে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন সীমান্ত চন্দ্র দাস নামে এক যুবক। মামলায় গ্রেপ্তার দুই প্রধান আসামির সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সীমান্ত আদালতে যে তথ্য দিয়েছেন, তার সঙ্গে গ্রেপ্তার দুই আসামির দেওয়া জবানবন্দির বেশির ভাগ তথ্যের মিল পাওয়া গেছে। হত্যাকাণ্ডের রাতে আসামিরা সীমান্তের বাসায় গিয়ে ইয়াবা সেবন করেছিলেন—সীমান্তের জবানবন্দিতেও এমন তথ্য উঠে এসেছে বলে জানিয়েছে তদন্তকারী সংস্থা।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সন্ধ্যায় রংপুরের মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে বিচারক মোহাম্মদ রফিকুল ইসলামের কাছে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় সীমান্তের জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। মাছুয়াপাড়া (দাসপাড়া) এলাকার বাসিন্দা সীমান্ত সুবাস চন্দ্র দাসের ছেলে। তিনি গ্রেপ্তার হওয়া মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসের বন্ধু। নগরের একটি মার্কেটের কাপড়ের দোকানে বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত তিনি।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের পরিদর্শক জিন্নাত আলী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, সীমান্ত তাঁর বাবাকে সঙ্গে নিয়ে আদালতে উপস্থিত হয়ে সাক্ষ্য দিয়েছেন। পরে বিচারক ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় তাঁর বক্তব্য রেকর্ড করেন।
তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, সীমান্তের দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে আসামিদের জবানবন্দিতে উঠে আসা তথ্যের মিল রয়েছে। বিশেষ করে হত্যাকাণ্ডের রাতে সীমান্তের বাড়িতে ইয়াবা সেবনের বিষয়টি দুই পক্ষের বক্তব্যেই এসেছে।
এর আগে মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে গ্রেপ্তারের পর রোববার আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার আবদুল মাবুদ জানিয়েছিলেন, হত্যাকাণ্ডের রাতে ওই দুই তরুণ সীমান্তের বাসায় গিয়ে ইয়াবা সেবন করেছিলেন।
গ্রেপ্তার দুই আসামির ডোপ টেস্ট করা হবে কি না জানতে চাইলে তদন্ত কর্মকর্তা জিন্নাত আলী জানান, সোমবার সকালে ডোপ টেস্টসংক্রান্ত ডকেট তিনি পেয়েছেন। এরই মধ্যে পরীক্ষার জন্য আবেদন করা হয়েছে। বুধবার (২৬ আগস্ট) প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাঠানোর কথা রয়েছে।
হত্যাকাণ্ড নিয়ে পুলিশের বক্তব্য ও বিভিন্ন তথ্যের মধ্যে অসঙ্গতি রয়েছে—এমন আলোচনা ও সমালোচনার বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, মামলাটি তদন্তের মাধ্যমেই সংশ্লিষ্ট প্রশ্নগুলোর উত্তর বের করার চেষ্টা করা হবে। হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে যেসব বিষয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, সেগুলোও তদন্তের আওতায় আনা হবে বলে জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য বের করে মামলায় ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার চেষ্টা থাকবে।
রোববার রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কোতোয়ালি থানায় নিহত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন।
এর আগে ওই দিন রাতে মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস আদালতে হাজির হয়ে হত্যার দায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। পরে আদালতের আদেশে তাঁদের কারাগারে পাঠানো হয়।
মামলাটির তদন্ত প্রথমে কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মিলন চ্যাটার্জির ওপর দেওয়া হয়েছিল। তবে পরদিন সোমবার তদন্তভার থানা-পুলিশের কাছ থেকে মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা শাখায় স্থানান্তর করা হয়। এরপর গোয়েন্দা বিভাগের পরিদর্শক জিন্নাত আলীকে নতুন তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
গণপতি চক্রবর্তী রংপুর জিলা স্কুলের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তিনি অবসর নেন। নগরের বাংলাদেশ ব্যাংক মোড় এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকার পর মাছুয়াপাড়া এলাকায় জমি কিনে নিজস্ব বাড়ি নির্মাণ শুরু করেন। দোতলা বাড়িটির নিচতলার কাজ তখনও সম্পূর্ণ হয়নি। প্রায় দুই থেকে তিন বছর ধরে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তিনি ওপরতলায় বসবাস করছিলেন। অবসরের পর তিনি হোমিওপ্যাথি চিকিৎসাও দিতেন।
গত শনিবার রাতে ওই বাসা থেকে গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী বালা (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী (২৫) এবং ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়মের (১২) মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য অনুযায়ী, চারজনকেই শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে।
এ ঘটনায় রোববার ভোরে একই এলাকা থেকে কানু দাসের ছেলে মুগ্ধ দাস (২৩) এবং বিনয় চন্দ্র দাসের ছেলে সিদ্ধার্থ দাসকে (১৯) আটক করা হয়। ওই দিন বিকেলে ময়নাতদন্ত শেষে চারজনের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে রাত সাড়ে ১০টার দিকে নগরের দখিগঞ্জ শ্মশানে তাঁদের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
এমএইচ
আরও পড়ুন










