ঢাকা, রবিবার   ১৯ জানুয়ারি ২০২০, || মাঘ ৬ ১৪২৬

Ekushey Television Ltd.

অস্তিত্ব সংকটে বেরোবি’র ‘দমদমা বধ্যভূমি’

বেরোবি প্রতিনিধি

প্রকাশিত : ২২:১৭ ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯ | আপডেট: ২২:১৮ ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯

বুদ্ধিজীবীদের স্মরণ ও বধ্যভূমি সংরক্ষণের জন্য ২০১০ সালে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত রংপুরের দমদমা বধ্যভূমির  দায়িত্ব নেয় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি) কর্তৃপক্ষ। কিন্তু দায়িত্ব নেয়ার ৯ বছর পরেও অরক্ষিত,অযত্ন আর অবহেলায় বিলীন হওয়ার উপক্রম হয়েছে দেশের অন্যতম এই বধ্যভূমি। এমনকি দীর্ঘ্যদিন অযত্নে থাকায় ফলকে শহীদদের নাম ফলকও মুছে গেছে।
 
এ পর্যন্ত সীমা নির্ধারণ না করায় বেসরকারি একটি কোম্পানি এবং স্থানীয় ভূমিখেকোদের দখল যজ্ঞে অস্তিত্ব সংকটে  রংপুর অঞ্চল এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ঐতিহাসিক স্থান। শুধুমাত্র ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস আসলেই বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে বধ্যভূমিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ ছাড়া সারা বছর অযত্ন আর অবহেলায় পড়ে থাকে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত এই বধ্যভূমি।
 
অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৭১ সালের ৩০ এপ্রিল রংপুর-ঢাকা মহাসড়কের দমদমা ব্রিজের কাছে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কারমাইকেল কলেজের ৪ শিক্ষক অধ্যাপক সুনীল বরণ চক্রবর্তী, অধ্যাপক রামকৃষ্ণ অধিকারী, অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন রায় এবং অধ্যাপক কালাচাঁদ রায় ও তার সহধর্মিণী মঞ্জুশ্রী রায় এবং মাছ ব্যাবসায়ি বাসু মিয়া ধরে এনে গুলি করে হত্যা করা হয়। এর রেশ কাটতে না কাটতেই ৭ জুন আবার এই স্থানে গভীর রাতে তিন ট্রাকক বোঝাইকৃত শত শত সাধারণ মানুষকে এনে আবারো এই দমদমা নামক স্থানে গুলি করে হত্যা করা হয়।

ঘটনার দীর্ঘদিন পর ২০০০ সালের ১৪ ডিসেম্বর ‘কারমাইকেল কলেজ শিক্ষক পরিষদ’ মহাসড়কের পাশে একটি স্মৃতিফলক ও মূল স্থানে একটি ছোট স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করেন। সবশেষ ২০১০ সালের ২৯ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবীদের স্মরণ ও বধ্যভূমি সংরক্ষণের দায়িত্ব নেয় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তবে দায়িত্ব নেয়ার ৯ বছর পার হলেও এটি সংরক্ষণে তেমন উদ্যোগ দেখা যায়নি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ থেকে। দীর্ঘ্যদিন আর সংস্কার না করায় ফলকটির অর্ধেক ধ্বসে পড়েছে। মুছে গেছে শহীদদের নাম ও স্মৃতিচিহ্ন।  

সরেজমিন বধ্যভূমি ঘুরে দেখা গেছে, বধ্যভূমির সীমা নির্ধারণপূর্বক কোনো সীমা প্রাচীরসহ স্থাপনা না থাকায় একটি বেসরকারি হাউজিং করপোরেশনের (জি.এম প্রোপার্টিজ-দেশবন্ধু গ্রুপের প্রতিষ্ঠান) উদ্যোগে দুইদিকে টিনের সীমানা প্রাচীর দেয়া হয়েছে। তোলা হচ্ছে বহুতল ভবন। মূল মহাসড়ক হতে স¤পূর্ণ ঢাকা পড়েছে স্থানটি। ফলে বিঘ্নিত হচ্ছে বধ্যভূমির প্রকৃর্ত মর্মার্থ। অন্যদিকে, ঠিক স্তম্ভের পাশ দিয়েই তৈরি করা হয়েছে রাস্তা। বধ্যভূমির অনেকখানি জায়গা সেই রাস্তায় গিয়ে পড়েছে। ফলে ক্রমান্বয়ে বিলীন হয়ে যাচ্ছে স্থানটির মূল ভিটেমাটি। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে বধ্যভূমির সংরক্ষণের জন্য জমিদানকারী পরিবার কথামত বধ্যভূমির জন্য ছয় শতক জমি দেয়। তবে বর্তমানে সেখানে ছয় শতক জমির কোনো অস্তিত্ব নেই তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। অনেকটা দখল আর বিলীন হতে বসেছে ঐতিহাসিক এই স্থানটি। 

বধ্যভূমির পাশেই বসবাস করা আতাউর রহমান এবং ফজলুল হকের সঙ্গে কথা হয় প্রতিবেদকের। তারা জানায় যুদ্ধের সময় তাঁর বয়স ছিল ১৫/১৭ বছর। তারা চার অধ্যাপক, সহধর্মিণীসহ আরও অনেককেই পাকিস্থানিদের হাতে খুন হতে দেখেছেন। সেখানে আরও কয়েকজন ছিলেন (ইতোমধ্যে মারা গিয়েছেন অনেকেই) যারা ঠিক বধ্যভূমির স্মৃতিস্তম্ভের নিচে লাশ দাফন করেন। তারা বলেন, গত ৪৮ বছরে অনেকবার অনেক মানুষকে (এর মধ্যে ভিসি, জেলা প্রশাসক, অধ্যক্ষ প্রমূখ) বলেছি জায়গাটি সীমানা বেষ্টনী দিয়ে দিতে আশ্বাস দিলেও কিন্তু কেউ সেটা করেননি। তারা অনেকটা ক্ষোভ নিয়েই প্রতিবেদককে কথাগুলো বলছিলেন এবং এক পর্যায়ে চোখের কোণায় পানি চলে আসে শহীদ বুদ্ধিজীবীসহ অন্যান্যদের হত্যার প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তিদের। 

জানা গেছে, সাবেক দুই ভিসির আমলে বিভিন্ন সময়ে বধ্যভূমির সীমানা নির্ধারণে ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়ে আশ্বাস প্রদান করলেও শেষ অবধি তা সম্ভব হয়নি। বর্তমান ভিসি যোগদানের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম সম্বলিত সাইনবোর্ড টাঙানো হলেও সীমানা নির্ধারণ কিংবা গবেষণার জন্য সংরক্ষণের বিষয়ে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দাবি বধ্যভূমিটি সংরক্ষরণ এবং গবেষণার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যেন খুব দ্রুত কার্যকারী উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
 
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় বঙ্গবন্ধরু আদর্শ এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষের শিক্ষকদের সংগঠন বঙ্গবন্ধু পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মশিউর রহমান বলেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা আজ ক্ষমতায়। এই সময়েও মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত বদ্ধভূমিগুলো রক্ষা করতে না পারাটা অত্যান্ত দুঃখ জনক। আমরা যদি বদ্ধভূমিগুলো রক্ষা করতে না পারি তাহলে তরুণ প্রজন্মের কাছে কিভাবে ছড়িয়ে দিব বুদ্ধিজীবীদের কি ভূমিকা ছিল এবং কি উদ্দেশ্যে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়েছে। এই ইতিহাসের সাক্ষ্যদানকারী স্থানগুলো যদি সংরক্ষন করতে না পারি তাহলে মুক্তিযুদ্ধের  ইতিহাস বিকৃত হয়ে যাবে। 

তিনি আরও বলেন, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় এক যুগে পা রাখলেও বেরোবির উপাচার্যগণ ব্যক্তি স্বার্থ হাসিলের জন্য প্রতিবছরই প্রতিশ্রুতি দিয়েই যান এবং শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে দমদমা বধ্যভূমিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন। জাতির স্বার্থ রক্ষায় বদ্ধভূমিটির যে দায়িত্ব নিতে হবে তা কেউ কখনো করে না।

এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ দেশের বাইরে থাকায় তার সাথে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য ড.সরিফা সালোয়া ডিনা জানান দমদমা বধ্যভুমি সংরক্ষণ করার জন্য কঠোর পদক্ষেপ নেয়া দরকার।  এ ব্যাপারে আমি উপাচার্য স্যারকে অনুরোধ জানাবো। যাতে অবিলম্বে ব্যাবস্থা গ্রহণ করা হয়।

কেআই/আরকে


 

© ২০২০ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি