ঢাকা, রবিবার   ২০ অক্টোবর ২০১৯, || কার্তিক ৫ ১৪২৬

Ekushey Television Ltd.

‘কোনদিন ভাবিনি স্যার এমনটা করবেন’

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ২২:১৯ ৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯

নিজের সাঁতার কোচের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগ করেছেন পশ্চিমবঙ্গের রিষড়ার এক কিশোরী সাঁতারু। বৃহস্পতিবার সকালেই টুইট করে নিজের ক্ষোভের কথা জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় ক্রীড়ামন্ত্রী কিরেন রিজিজু। অভিযুক্ত সাঁতার কোচের বিরুদ্ধে কড়া শাস্তির প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন তিনি।

জানা গেছে, সাঁতার কোচ সুরজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়কে ঈশ্বরের আসনে বসিয়েছিল ওই কিশোরী সাঁতারু। এমনকি তার পরিবারও। কোচের ডাকে সাড়া দিয়ে তাই চলতি বছরের মার্চে সপরিবার গোয়া চলে গিয়েছিলেন তারা। সেখানে যাওয়ার পর থেকেই যৌন হেনস্থার শুরু। দীর্ঘ ছ’মাস নানা অছিলায় সুরজিৎ জাতীয় প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া ওই কিশোরী সাঁতারুকে যৌন হেনস্থা করতেন বলে অভিযোগ। 

লজ্জায়, অপমানে, ভয়ে নিজেকে গুটিয়ে রাখত মেয়েটি। দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া অবস্থায় এক দিন নিজেই ঠিক করে ফেলে, সব ফাঁস করে দেবে। সেই মতোই কোচের দুষ্কর্মের ভিডিও মোবাইলবন্দি করে সে। 

এ দিন কিশোরী বলে, গোয়া যাওয়ার পর থেকেই স্যার আমার সঙ্গে খুব খারাপ আচরণ করতেন। ব্ল্যাকমেইল করতেন। আমি আর মানসিক ভাবে নিতে পারছিলাম না। তখনই ঠিক করি, কিছু একটা করতে হবে। সেই মতো মোবাইলে ওই ভিডিও রেকর্ড করি।

জাতীয় প্রতিযোগিতা থেকে পদক জেতা পশ্চিমবঙ্গের ওই কিশোরী সাঁতারু গোয়া থেকে পালিয়ে আসার কাহিনীও এ দিন শোনায়। তার কথায়, ‘স্যার তখন গোয়ায় ছিলেন না। সিনিয়র ন্যাশনাল মিটের জন্য ভোপালে গিয়েছিলেন। সেই সময়েই আমরা পালিয়ে আসি রিষড়ার বাড়িতে। স্যার ওখানে থাকলে আমরা হয়তো ফিরতেই পারতাম না। আরও বড় ক্ষতি হয়ে যেত আমার।’

এর পর অনেকটা স্বগতোক্তির মতোই কয়েকটা বাক্য উঠে এল ওই কিশোরীর ধরে আসা গলায়, ‘গত পাঁচ বছর ধরে স্যারের পরিবারের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক, খুবই ভাল ছিল। স্যারের ছেলেও খুব ভাল সাঁতারু।’ একটু থেমে, ‘কোনও দিন ভাবিনি, স্যার আমার সঙ্গে এ রকম...!’ কথা আর শেষ করতে পারে না ১৫ বছর বয়সী ওই কিশোরী। 

কিশোরী সাঁতারুর এই বিস্ফোরক অভিযোগের পরে সুরজিৎকে নিয়ে এখন কানাঘুষো শোনা যাচ্ছে কলকাতার সাঁতার মহলে— অতীতেও নাকি তিনি এমন কাণ্ড ঘটিয়েছেন! কিন্তু, কোচের কুকীর্তি নিয়ে কেউ মুখ খুলতে চাননি। নিজেদের ক্যারিয়ার নষ্ট হওয়ার কথা ভেবে। তবে সে সবের কোনও প্রমাণ নেই বলেই প্রকাশ্যে তা নিয়ে কেউ মুখ খুলতে চাননি। 

তবে সুরজিতের উপর যে কলকাতার সাঁতার মহল ভীষণই ক্ষুব্ধ, তা টের পাওয়া গেল প্রাক্তন সাঁতারু বুলা চৌধুরীর কথায়। তিনি বলেন, ‘আজ শিক্ষক দিবস। শিক্ষক তো বাবার থেকেও বড়। শিক্ষক হিসেবে সুরজিতের এই ব্যাভিচার মেনে নেওয়া যায় না। আমার তো সব শুনে প্রচণ্ড রাগ হচ্ছে।’

ক্রীড়ামন্ত্রী কিরেন রিজিজুর সিদ্ধান্তকে সঠিক বলেই মনে করছেন বুলা। তার কথায়, ‘ক্রীড়ামন্ত্রী একদম সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কোথাও যেন চাকরি না পায় ওই লোকটা (সুরজিৎ)। তবে, মেয়েটার মানসিক অবস্থা আমি উপলব্ধি করতে পারছি। আশা করব, যে সাঁতারের জন্য ওকে এত বড় মূল্য দিতে হয়েছে, সেই সাঁতার যেন ও না ছাড়ে। প্রচণ্ড মানসিক শক্তির পরিচয় দিয়েছে। ওর সারা জীবন পড়ে রয়েছে। আগামী দিনেও এ রকম কঠিন মানসকিতারই যেন পরিচয় দেয় মেয়েটা।’

একই কথা বলছেন অলিম্পিয়ান দীপা কর্মকারের কোচ বিশেশ্বর নন্দী। এ দিন আগরতলা থেকে তিনি বলেন, ‘ঘটনাটি যদি ১০০ শতাংশ সত্যি হয়, তাহলে আইনি প্রক্রিয়ায় যা সাজা হওয়া দরকার তাই যেন হয় ওই কোচের।’

কোচের এই ‘কীর্তি’র কথা জানতে পেরে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ টেবল টেনিস খেলোয়াড় পৌলমী ঘটক। তিনি এ দিন বলেন, ‘বাবার পরেই আমরা কোচকে রাখি। একটা-দুটো ঘটনার প্রেক্ষিতে সবাইকে একভাবে বিচার করা ঠিক হবে না। মেয়েটা যে সাহসের পরিচয় দিয়েছে, তাতে আমি গর্ব বোধ করছি। ও আরও অনেক মেয়েকে সাহস দিয়ে গেল।’

এদিকে মেয়েকে নিয়ে গর্বিত ওই কিশোরীর বাবাও। ভয়-আতঙ্ক-মেয়ের ক্যারিয়ার— সব কিছুকে সরিয়ে তিনি ফেসবুকে লিখেছেন, ‘বাবা হিসেবে এই পোস্ট লিখতে আমার ভীষণ খারাপ লাগছে। আমার মেয়ের সমবয়সী তো ওঁর (সুরজিতের) ছেলে রয়েছে। এই নোংরামি করার আগে কি একবারও ছেলের কথা ওঁর মনে পড়ল না?’ 

এ দিন রাজ্য পুলিশের বিরুদ্ধে অসহযোগিতার অভিযোগও তুলেছেন তিনি। সোমবার রাতে তারা প্রথম রিষড়া থানায় গিয়েছিলেন অভিযোগ দায়ের করতে। কিন্তু পুলিশ তাদের গোয়ায় গিয়ে অভিযোগ দায়ের করাতে পরামর্শ দেয়। এরপর মঙ্গলবার দুপুরে চন্দননগর পুলিশ কমিশনারেটের ডেপুটি কমিশনার (শ্রীরামপুর) ঈশানী পালের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। সমস্তটা শুনে তিনি অভিযোগ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন। 

কিন্তু কিশোরীর পরিবারের অভিযোগ, বুধবার রাতে দীর্ঘ ক্ষণ তাদের অপেক্ষা করিয়ে রেখেও অভিযোগ নেয়নি রিষড়া থানা। পরে বৃহস্পতিবার দুপুরে ওই অভিযোগ দায়ের করতে পেরেছেন তারা।

লড়াই করতে পানিতে নেমেছিল ওই কিশোরী। আচমকা সেই পানিই কেড়ে নিচ্ছিল লড়াইটা। ফের সেই লড়াইতেই ফিরতে চায় ওই কিশোরী। তবে এবারের লড়াইয়ে তার পাশে রয়েছে সকলেই। কেন্দ্রীয় ক্রীড়ামন্ত্রী কিরেন রিজিজুও তেমনই আশ্বাস দিয়েছেন। সূত্র-আনন্দবাজার। 

এনএস/

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি