ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ১৮ জুলাই ২০১৯

ভ্যাট আইনে ব্যাপক ছাড়

 প্রকাশিত: ২১:২৭ ১৩ জুন ২০১৯  

জাতীয় বাজেটে ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর-মুসক) আইন বাস্তবায়ন করার কথা বলা হয়েছে। এ আইন কিভাবে কাজ করবে এবং কি হারে ভ্যাট দিতে হবে তার কথাও বলা হয়েছে নতুন বাজেটে। বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ২০১৯-২০২০ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব করেছেন। মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন ২০১২ কিভাবে কাজ করবে তার ব্যাখ্যা এ বাজেট প্রস্তাবে তুলে ধরেছেন মন্ত্রী।

অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ী মহলের দাবির প্রতি সম্মান দেখাতে অধিকতর যুগোপযোগী ও ব্যবসাবান্ধব করার লক্ষ্যে আইনে কিছু সংস্কার ও সহজীকরণ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের মূসকের বাইরে রাখতে বার্ষিক টার্নওভার ৫০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত মূসক থেকে অব্যাহতি প্রদান হয়েছে এবং বার্ষিক টার্নওভার ৫০ লক্ষ টাকা হতে ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত ৪ শতাংশ হারে টার্নওভার কর দেওয়ার সুযোগ দেয়া হয়েছে। মূসক নিবন্ধন সীমা ৮০ লক্ষ টাকা হতে ৩ কোটি টাকায় উন্নীতকরণ করা হয়েছে। পণ্যের অব্যাহতি, সেবার অব্যাহতি ও সম্পূরক শুল্ক হারের সমন্বয়ে ৩টি তফসিল রয়েছে এ আইনে।

১৫ শতাংশ মূসকের পাশাপাশি নির্দিষ্ট পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে ৫, ৭.৫ ও ১০ শতাংশ মূসক আরোপ করা হয়েছে। কিছু পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে সুর্নিদিষ্ট কর নির্ধারণ করা হয়েছে। ঔষধ ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের ক্ষেত্রে বর্তমানের ন্যায় স্থানীয় ব্যবসায়ী পর্যায়ে মূসকের হার যথাক্রমে ২.৪ শতাংশ এবং ২ শতাংশ অব্যহত রাখা হয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী পর্যায়ে করভার কমানো জন্য মূসক হার ৫ শতাংশ করা হয়েছে। নতুন আইনটি অনলাইন ভিত্তিক বিধায় বিভিন্ন পণ্য ও সেবা সরবারহের ক্ষেত্রে চালানের তথ্য ধারনের জন্য দোকান ও ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে ইলেক্ট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস ও সেলস ডেটা কালেকটর স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় বলেন, মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন ২০১২ এর কিছু সংশোধন, পরিমার্জন, পরিবর্তন ও সংযোজনের প্রস্তাব করা হয়েছে। আইন পরিবর্তনের সাথে সঙ্গতি রেখে মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক বিধিমালা ২০১৬ এর কতিপয় বিধি সংশোধন, পরিবর্তন, পরিমার্জন ও সংযোজন করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
নতুন মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট আইনে কয়েকটি খাতকে এর আওতা মূক্ত রাখা হয়েছে। সরকারের অগ্রাধিকারমূলক ও বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চলে (বেজা) ও পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) মত ফাস্ট ট্রাকভৃক্ত প্রকল্পে বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানসমূহকে ভ্যাটের আওতামূক্ত রাখতে সংসদে প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী।
ভারী প্রকৌশল শিল্প, রপ্তানি খাতের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং দেশীয় শিল্পের প্রতিরক্ষণ ও বিকাশের জন্য অটোমোবাইল, রেফ্রিজারেটর, ফ্রিজার, এয়ার কন্ডিশনার, মোটরসাইকেল, মোবাইল শিল্পসহ কতিপয় শিল্পখাতে বর্তমানের ন্যায় মূসক ও সম্পূরক শুল্ক থেকে বাইরে রাখার প্রস্তাব করা হয়।

দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠির কথা বিবেচনা করে বনরুটি ও পাউরুটি, হাতে তৈরী কেক ও বিস্কুকের ১৫০ টাকা পর্যন্ত মূসক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। কৃষিখাতে প্রনোদনার জন্য পাওয়ার রিপার, পাওয়ার টিলার অপারেটেড সিডার, লোলিক্ট পাম্প, রোটারী টিলারের উপর মূসক অব্যাহতির কথা বলা হয়েছে। নারী উদ্যোক্ত পরিচালিত ব্যবসায়ীক শো রুম, বাংলাদেশ হাইটেক পার্কে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যোগানদার ও বিদ্যুৎ বিতরণকারী সেবা, অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক গ্যাস, যোগানদার ও বিদুৎ সেবার উপর মূসক রাখা হয়নি।

পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশীপ প্রকল্পে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে নির্মাণ সংস্থা, করসালটেন্সি ও সুপাভাইসারি ফার্ম, যোগানদার ও আইন পরামর্শক সেবার উপর মূসক রাখা হয়নি। রূপপুর পারমানবিক বিদুৎ কেন্দ্র প্রকল্পের ক্ষেত্রে ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার্স, ক্লিয়ারিং ও ফরোয়াডিং সংস্থা, বীমা কোম্পানি, যোগানদার ও ব্যাংকিং সেবার উপর মূসক অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের উৎসাহ ও সম্মান প্রদান করে এসব বিষয়কে মূসকের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে বলে বাজেটে বলা হয়।

এদিকে কিছু পণ্যের উপর করারোপ করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এ সব পণ্য মূসকের বাইরে ছিল। প্লাস্টিক ও এ্যালুমিনিয়ামের তৈরী তৈজসপত্র, সয়াবিন তেল, পাম ওয়েল, সানফ্লাওয়ার ওয়েল, সরিষার তেল, টিভি ও অনলাইনের মাধ্যমে অনুষ্ঠান সরবারহকারী, জ্যোতিষী ও ঘটকালী ইত্যাদি সেবার ওপর স্থানীয় পর্যায়ে এবং টেলিকম সেক্টরের উপর আমদানি পর্যায়ে মুসক আরোপ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

দেশীয় শিল্পের সুরক্ষার জন্য কিছু সেবার ওপর সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করেন অর্থমন্ত্রী। যানজট নিরসন ও গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নের লক্ষ্যে যাত্রীবাহী বাস, পণ্যবাহী ট্রাক ও লরি, থ্রি হুইলার, এ্যম্বুলেন্স ও স্কুলবাস ব্যতীত অন্যান্য সকল গাড়ির রেজিস্ট্রেশন, রুট পারমিট, পিটনেস সনদ, মালিকানা সনদ গ্রহন ও নবায়নের ক্ষেত্রে যে চার্জ পরিশোধ করা হয় তার উপর ১০ শতাংশ করারোপ করা হয়েছে।
হেলিকপ্টার ও চার্টার্ড বিমানের যাতায়াতের উপর ২০ শতাংশের পরিবর্তে ২৫ শতাংশ, আইসক্রিমের উপর ৫ শতাংশ, মোবাইল ফোনের সিম/রিম কার্ড ব্যবহারের মাধ্যমে প্রদত্ত সেবার বিপরীতে সম্পূরক শুল্ক ৫ শতাংশ পরিবর্তে ১০ শতাংশ মূসক নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিশ্বব্যাপী ধূমপান বিরোধী রাষ্ট্রীয় নীতির সাথে সামঞ্জস্য বিধান, স্বাস্থ্য ঝুঁকি কমানো এবং রাজস্ব আয় বৃদ্ধির জন্য তামাক ও তামাকজাত পণ্যের ক্ষেত্রে শুল্ক বৃদ্ধি করা হয়েছে। সিগারেটের নিম্নস্তরের দশ শলাকার (দশ পিছ) দাম ৩৭ টাকা এবং সম্পূরক শুল্ক ৫৫ শতাংশ, মধ্যম স্তরের দশ শলাকার দাম ৬৩ টাকা এবং সম্পূরক শুল্ক ৬৫ শতাংশ, উচ্চ স্তরের দশ শলাকার দাম ৯৩ ও ১২৩ টাকা যার সম্পূরক শুল্ক ৬৫ শতাংশ নিধারণ করা হয়েছে। হাতে তৈরী ফিল্টারবিহীন বিড়ির ২৫ শলাকার দাম ১৪ টাকা যার সম্পূরক শুল্ক ৩৫ শতাংশ, ফিল্টার সংযুক্ত বিড়ির ২০ শলাকার দাম ১৭ টাকা যার সম্পূরক শুল্ক ৪০ শতাংশ প্রস্তাব করা হয়েছে। স্বাস্থ্যের জন্য বেশ ক্ষতিকর হওয়ায় বিড়ি ও সিগারেটের মত জর্দা ও গুলের উপরও শুল্ক বৃদ্ধি করা হয়েছে। দশ গ্রাম জর্দার দাম ৩০ টাকা যার সম্পূরক শুল্ক ৫০ শতাংশ, দশ গ্রাম গুলের দাম ১৫টাকা যার সম্পূরক শুল্ক ৫০ শতাংশ করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, গত ২০১৭-১৮ অর্থবছরে আইনটি কার্যকর করার প্রস্তাব করা হয়েছিল। তবে ব্যবসায়ীদের অনুরোধে দুই বছরের জন্য আইনটি স্থগিত রাখা হয়। দুই বছরে পরে তবে এ আইনটি চলতি অর্থবছর বাস্তবায়ন করা হবে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাথে ইতোমধ্যেই ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো এক মত হয়েছে।

এমএস/আরকে

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি