ঢাকা, বুধবার   ২০ নভেম্বর ২০১৯, || অগ্রাহায়ণ ৬ ১৪২৬

Ekushey Television Ltd.

যমুনায় অর্থের বিনিময়ে ইলিশ ধরার প্রতিযোগীতায় জেলেরা

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি

প্রকাশিত : ১৮:৪০ ২২ অক্টোবর ২০১৯

প্রজননের মৌসুমে যমুনায় প্রচুর ইলিশের কারণে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও বসে নেই উত্তরবঙ্গের প্রধান মোহনা সিরাজগঞ্জের চৌহালীর জেলেরা। সর্বক্ষণ যমুনা নদী জুড়ে ডিমওয়ালা ইলিশ নিধন অব্যাহত রেখেছে তারা। সরকারি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে, অভিযান অব্যহত থাকার পরও হাজার-হাজার জেলেদের ইলিশ ধরা এখন এক ধরনের প্রতিযোগীতায় রুপ নিয়েছে।

তবে অভিযোগ উঠেছে, অসাধু কিছু পুলিশ কর্মকর্তা, মৎস্য অফিসের কর্মচারি ও দু-একজন জনপ্রতিনিধির সমন্বিত সিন্ডিকেটকে ৩-৫ হাজার টাকা দিয়ে জেলেরা মাছ ধরার সুযোগ পাচ্ছে। যা মাছ ধরা জেলেরাই স্বীকার করেছে। তবে এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তারা। 

এদিকে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ ধরা জেলেদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রাখার পাশাপাশি টাকা আদায়কারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।

সিরাজগঞ্জের ৯টি উপেজলার মধ্যে কাজিপুর, সদর, বেলকুচি, চৌহালী ও শাহজাদপুর উপজেলা হচ্ছে যমুনা নদী বিদৌত। এসব উপজেলার চর ও পাড়ের মানুষগুলোর কৃষির পরেই মাছ আহরণ অন্যতম পেশা হওয়ায় ৪ হাজার ৩৮৭ জন নিবন্ধিত জেলে রয়েছে। তবে অনিবন্ধিত কয়েক গুন। 

বিশেষ করে যমুনার চর এলাকা ঘেরা দুর্গম জনপদ চৌহালী উপজেলার অধিকাংশ অভাবী পরিবারের প্রধান পেশা মাছ শিকার। এখানে নিবন্ধিত ১ হাজার ৪৫২ জন জেলেসহ প্রায় ৪ সহস্রাধিক জেলে এ কাজে জড়িত। ইলিশ, ঘাইড়া, আইড়, বাতাসি, চাপিলাসহ নদীর অন্যান্য সুস্বাদু মাছ ধরতে তাদের ঘের, জাল ও নিষিদ্ধ ক্যারেন্ট জালই হচ্ছে প্রধান উপকরণ। 

উমরপুর, বাঘুটিয়া, খাসকাউলিয়া, ঘোরজান, খাসপুকুরিয়া ইউনিয়নের এসব জেলেরা তাদের ছোট-বড় ইঞ্জিন চালিত নৌকা করে দিন-রাত মাছ আহরণের কাজ করছে। 

প্রতিবারের ন্যায় ইলিশের বংশ বিস্তারে গত ৯ অক্টোবর থেকে আগামী ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত প্রজনন মৌসুমে ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে সরকার। এ সময়কালীন আহরণ, মজুদ, পরিবহন ও বিক্রি নিষিদ্ধ। 

তবে এ মৌসুমে জেলার অন্য এলাকার চেয়ে চৌহালী উপজেলা জুড়ে ব্যাপকভাবে এই মাছের বিস্তার হওয়ায় অন্যান্য বছরের মত নিষেধাজ্ঞার মৌসুমে জেলেরা কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে অবৈধ ক্যারেন্ট জাল দিয়ে দিন-রাত ইলিশ নিধনে ব্যস্ত সময় পার করছে। এজন্য অন্যান্য বছরের সকল রেকর্ড ভেঙ্গে কৌশলে দ্বিগুন ক্যারেন্ট জাল ও নৌকা তৈরী করে যমুনায় নেমেছে। 

সরেজমিনে যমুনা নদীর উমরপুর, খাসকাউলিয়া, ঘোরজান ইউনিয়নসহ আশপাশের এলাকা ঘুরে দেখা যায়, নদীজুড়ে অবাধে জুড়ে দেয়া হয়েছে ক্যারেন্ট জাল। নৌকা করে প্রতিটি জেলে জাল ফেলছে ও ফাঁদে আটকানো অসংখ্য মা ইলিশ ছাড়াচ্ছে জেলেরা। অপরিচিত নৌকা দেখলেই জাল-দড়ি রেখেই পালাচ্ছে তারা। 

ঘোরজান ইউনিয়নের চর ধিতপুরের রওশন আলী শেখ জানান, মাছ ধরতে এলাকার সব জেলেরা পুলিশকে ৩ হাজার করে টাকা দিয়েছে। তাই পুলিশ আসলে সমস্যা হয়না। অভিযানের কথা আগে থেকেই জানতে পারে সব জেলেরা। আর পুলিশ আসলেও কয়েকটি মাছ নিয়ে চলে যায়। 

এদিকে মির কুটিয়ার জহির উদ্দিন, মুরাদপুরের আব্দুর রাজ্জাক, হিজুলিয়ার আহম্মদ আলীসহ কয়েকজন জেলে জানান, আমরা অভাবী মানুষ। বছরের এই সময়টার জন্যই অপেক্ষা করি। এখন মাছ যদি না ধরি, তা চলে যাবে। তাই পেটের তাগিদেই এই সময়টা কাজে লাগাই। যতই অভিযান চলুক উপায় নেই বলেও জানান তারা। 

চৌহালী উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি হাজী আব্দুল আলীম অভিযোগ করে জানান, পুরো নদীজুড়ে অবাধে মা ইলিশ নিধন চলছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার ভূমিকা প্রশংসার দাবি রাখলেও পুলিশের বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ। অধিকাংশ জেলে পুলিশ কর্মকর্তাকে টাকা দিয়ে মাছ শিকার করছে। দু’একজন জনপ্রতিনিধিও এজন্য দায়ী। তাই তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া দরকার।

তবে চৌহালী থানার ওসি রাশেদুল ইসলাম বিশ্বাস পুলিশের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ অসত্য দাবি করে জানান, অন্যবারের চেয়ে এবার কয়েক গুন বেশি তৎপরতা নিয়ে পুলিশ ইলিশ রক্ষায় কাজ করছে। টাকা নেয়ার বিষয়টি ভিত্তিহীন। 

এ বিষয়ে চৌহালী উপজেলা নির্বাহী অফিসার দেওয়ান মওদুদ আহমেদ জানান, ২৫ কিলোমিটার বিশাল এলাকাজুড়ে আমাদের একটি টিম দিয়ে পুরো মাছ রক্ষা করা সম্ভব নয়। তারপরও আমরা দিন-রাত জেলেদের মাছ নিধনের বিরদ্ধে অভিযান পরিচালনা করছি। 

এ পর্যন্ত ৭৪ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়েছে। ২ লাখ ৭৯ হাজার ৫০ মিটার জাল পোড়ানোর পাশাপাশি জব্দ করা ২৬২ কেজি ইলিশ অসহায়দের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে। অভিযান এখনো অব্যাহত আছে।

আই/এসি

 

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি