ঢাকা, শনিবার   ১৮ জানুয়ারি ২০২০, || মাঘ ৫ ১৪২৬

Ekushey Television Ltd.

রাজাকার-পুত্রের কবলে ‘মুক্তির মঞ্চ’সহ কোটি টাকার সম্পদ

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি

প্রকাশিত : ১৯:৫০ ৮ ডিসেম্বর ২০১৯

তাহিরপুরের সেই সরকারি সম্পদ ও দখলদার শামিম তালুকদার

তাহিরপুরের সেই সরকারি সম্পদ ও দখলদার শামিম তালুকদার

সুনামগঞ্জে একাত্তরের মহান স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ৫নং সেক্টরের ‘মুক্তির মঞ্চ’সহ কয়েক কোটি টাকার সরকারি সম্পদ দখলে নেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ অভিযোগ উঠেছে সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের তরং গ্রামের প্রয়াত আব্দুর রউফ তালুকদারের ছেলে শামীম আহমদ তালুকদারসহ বেশ ক’জন প্রভাবশারীর বিরুদ্ধে।

এ নিয়ে গত কয়েক বছর ধরে শতাধিক মুক্তিযোদ্ধার স্বাক্ষরিত লিখিত অভিযোগপত্র দেয়া হয় সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক ও তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর। কিন্তু অদৃশ্য কারণে দখল হওয়া সরকারি জমি ও ‘মুক্তির মঞ্চ’ উদ্ধার কেবল নোটিশেই সীমাবদ্ধ রেখেছেন প্রশাসন।

মুক্তিযোদ্ধাগণ তাদের দেয়া লিখিত অভিযোগে জানান, সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার বড়ছড়া মৌজার ১নং খতিয়ানভুক্ত এসএ ও আরএস দাগে ৭৬.৩৬ একর সরকারি জমি রয়েছে। ওই মৌজার ওই দাগে খতিয়ানের থাকা প্রায় এক (১) একর জমি জুড়ে থাকা ৭১’র মুক্তির মঞ্চ, সমাবেশ স্থল, ছোট মাঠ, তিনটি ভবন, ভবনের ভেতর থাকা চেয়ার, টেবিল, আলমিরা, সোফা, টেলিভিশন, খেলাধুলার উপকরণ, ১২টি জোড়া ড্রাম, মূল্যবান লোহাজাত সামগ্রী, অর্ধশত ফলদ-বনজ দুর্লভ প্রজাতির বৃক্ষ, দুটি টয়লেটসহ প্রায় এক (১) একর জমি দখলে নেন পাক-সেনাদের দোসর আব্দুর রউফের ছেলে শামীম আহমদের নেতৃত্বে থাকা একদল ভূমিখেকো দানবচক্র।

এরপর ২০১৫ সালে রাতের আঁধারে ব্যক্তি মালিকানাধীন নাম সবস্ব একটি কিন্ডার গার্টেন’র  সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেয়া হয়।

পরবর্তীতে জনসমাগম ও প্রশাসনের দৃষ্টিতে দখলবাণিজ্য আড়াল করতে জনচলাচলের একমাত্র কাঁচা সড়কটিও লোহাজাত সামগ্রী দিয়ে বন্ধ করে দেয়া হয়।
 
শুধু সরকারি কোটি টাকার জমি দখলই নয়, ওই জমির উপর থাকা বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ড্রাষ্ট্রিজ কর্পোরেশন (বিসিআইসি)’র ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরী লিমিটেডের ট্যাকেরঘাট চুনাপাথর খনি (পতিত) প্রকল্পের প্রায় ৩০ লাখ টাকা মূল্যের শ্রমিক-কর্মচারী ক্লাব, শ্রমিক ইউনিয়ন ভবন, শ্রমিক কর্মচারী ক্যান্টিনসহ তিনটি প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় আসবাবপত্র দখলে নিয়েছেন শামীম গংরা।
 
পাক সেনাদের দোসর প্রয়াত (রাজাকার) আব্দুর রউফ তালুকদারের ছেলে শামীম আহমদ তালুকদার ‘মুক্তির মঞ্চ’সহ সরকারি সম্পদ দখলের নেতৃত্বে রয়েছেন বলেও তারা অভিযোগে উল্লেখ করেন।
  
গত ৩ ডিসেম্বর বিকেলে উপজেলার শ্রীপুর উওর ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা আলকাছ উদ্দিন বললেন, মুক্তির মঞ্চ, সমাবেশস্থল, ছোট মাঠ, তিনটি ভবন টিনশেড বেষ্টনীতে অবরুদ্ধ করে রেখে বাহিরে কিন্ডার গার্টেন’র সাইনবোর্ড ঝুলালেও মূলত ভেতরে শামীম গংরা ভবনগুলো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিকট সময় সময়ে ভাড়া প্রদান, গরু চড়ানোর মাঠ, মালবাহী লরি, পিকআপ ভ্যান রাখা এবং নিজেদের ব্যক্তিগত অফিস হিসাবেই ব্যবহার করে আসছেন।

উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার (অব. সেনা সদস্য) মুক্তিযোদ্ধা ধন মিয়া জানান, প্রশাসনের উদাসীনতা, রাজনৈতিক দলের গুটি কয়েক নেতার তদবীর বাণিজ্যের কারণে বারবার থেমে যাচ্ছে কয়েক কোটি টাকার মূল্যের দখলে থাকা সরকারি জমি ও ‘মুক্তির মঞ্চ’ উদ্ধারকাজ।
 
তিনি আরও বলেন, উচ্ছেদের প্রসঙ্গ আসলেই দু’হাতে টাকা খরচ করে আর তদবীরের মুখেই থামিয়ে দেয়া হয় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাণের দাবি ‘মুক্তির মঞ্চ’ উদ্ধার কাজ।
 
বিসিআইসির ট্যাকেরঘাট চুনাপাথর খনি প্রকল্প উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী শামসুল আরেফিন সুইট, আবুল ফয়েজ মন্টু, সজিব আহমদে সজল জানান, যে জায়গাটি বা ভবনগুলো শামীম গংরা দখলে নিয়েছেন তা কেবল দখল বাণিজ্যের নেতিবাচক চর্চার ফসলই নয়, এখানে থাকা মুক্তির মঞ্চ ও মাঠে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের পর থেকেই ভাষা, স্বাধীনতা, বিজয় দিবস,জাতীর জনক বঙ্গ বন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শোক দিবস, প্রয়াত শহীদ মুক্তিযোদ্ধাগণের শোক-স্মরণ সভা পালনসহ রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন দিবস, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সভা সমাবেশ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, গণমিলন কেন্দ্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক খেলাধুলা ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান হয়ে আসছিলো।
 
উপজেলার যোদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক জেলা কমান্ডার আলহাজ্ব মোজাহিদ উদ্দিন আহমদ  বলেন, ৭১’র মহান স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে তাহিরপুরের শ্রীপুর উওর ইউনিয়নের নয়াবন্দ গ্রামের প্রয়াত শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান চিহ্নিত এক রাজাকার তরং গ্রামের প্রয়াত আব্দুর রউফ তালুকদারের ভগ্নিপতি (চাচাত বোনের জামাই) ছিলেন। 

সেই রাজাকার ভগ্নিপতির সাথে আব্দুর রউফ সে সময় পাকিস্তানি সেনাদের দোসর (রাজাকার) হিসাবে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী কর্মকাণ্ডে নিজেকে সক্রিয় রাখেন।
  
এদিন শামীম আহমদ তালুকদার গণমাধ্যমের নিকট তার বিরুদ্ধে আনা সকল অভিযোগ অস্বীকার করলেও তিনটি ভবনসহ ৭৫ শতাংশ সরকারি জমি দখলে নেয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, জেলা প্রশাসকের নিকট আবেদন করলেও ওই জমি এখনও আমাদের বন্দোবস্ত দেয়া হয়নি।
 
জেলা প্রশাসক কতৃক বন্দোবস্ত না দেয়ার পূর্বেই কোন আইনে সরকারি জমি দখলে নিলেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা চেষ্টা করছি জমিটি বন্দোবস্ত পেতে। আশা করি খুব শীঘ্রই তা পেয়েও যাব।   

তার পিতা প্রয়াত আব্দুর রউফ পাকিস্তানি সেনাদের দোসর ছিলেন না দাবি করে তিনি আরও বলেন, যে জায়গা দখলের অভিযোগ করা হয়েছে, সে জায়গায় আপাতত কিন্ডার গার্টেন চালু করা হয়েছে। সেখানে মুক্তির মঞ্চ বা মুক্তিযুদ্ধের কোনও কিছুই ছিলনা।
 
তিনি আরও জানান, তাহিরপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক এ কিন্ডার গার্টেনের সভাপতি স্বপন কুমার দাস, সহ-সভাপতি কয়লা ব্যবসায়ী পুইট্যার রিয়াজ উদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক আমি নিজে, যুগ্ম সম্পাদক কয়লা ব্যবসায়ী মাটিকাঁটার ডা. মাসুদ ও কেশিয়ার অপর কয়লা ব্যবসায়ী শ্রীপুর ৩নং ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সভাপতি লাকমার জসীম উদ্দিন।
   
তাহিরপুর উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভুমি) মো. মুনতাসির হাসান বলেন, আমরা ট্যাকেরঘাটে সরকারি জমিতে দখলে থাকা শামীমসহ সব দখলদারকেই নোটিশ প্রেরণ করেছি। পরবর্তীতে মামলা দায়েরের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন থাকায় উচ্ছেদ অভিযান কিছুটা বিলম্বিত হচ্ছে।

সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ বলেন, আমি এ বিষয়ে ইতোপূর্বেই তাহিরপুরের সহকারি কমিশনারকে (ভূমি) দিক নির্দেশনা দিয়েছি। সেখান থেকে কোন প্রতিবেদন এখনও পাওয়া যায়নি। প্রতিবেদন পেলে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এনএস/

© ২০২০ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি