ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২৮ মে ২০২০, || জ্যৈষ্ঠ ১৪ ১৪২৭

Ekushey Television Ltd.

তিউনিসিয়ায় নৌকাডুবি

‘৮২ জন একরুমে, গোসল নাই তিন মাস’

প্রকাশিত : ০৯:২০ ১৩ মে ২০১৯ | আপডেট: ০৯:৪৩ ১৩ মে ২০১৯

তিউনিসিয়ায় রেড ক্রিসেন্টের আশ্রয় কেন্দ্রে উদ্ধার পাওয়া কয়েকজন বাংলাদেশি।

তিউনিসিয়ায় রেড ক্রিসেন্টের আশ্রয় কেন্দ্রে উদ্ধার পাওয়া কয়েকজন বাংলাদেশি।

লিবিয়া থেকে ছোট্ট নৌকায় চেপে খুবই বিপদংসকুল পথে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে পৌঁছানোর চেষ্টা করছিল তারা। সেই নৌকাডুবিতে যারা মারা গেছে, বলা হচ্ছে তাদের মধ্যে অন্তত ৪০ জন বাংলাদেশি।

তিউনিসিয়ার একদল জেলে সাগর থেকে মোট ১৬ জনকে উদ্ধার করে। এদের মধ্যে ১৪ জনই বাংলাদেশি। এদের এখন রাখা হয়েছে তিউনিসিয়ার উপকূলীয় শহর- জারজিসের একটি আশ্রয় কেন্দ্রে।

তিউনিসিয়ার রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির একজন কর্মকর্তা মঞ্জি স্লেমের মাধ্যমে অনেক চেষ্টার পর বিবিসি বাংলা এই বাংলাদেশিদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম হয়।

টেলিফোনে আশ্রয় কেন্দ্রে থাকা দুজন বাংলাদেশি বিবিসির কাছে বর্ণনা করেছেন, কী ভয়ংকর অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে তাদের যেতে হয়েছে, কীভাবে সাগরে মৃত্যুর মুখ থেকে তারা ফিরে এসেছেন:

সিজুর আহমেদ, সিলেট

ঢাকা থেকে দুবাই। দুবাই থেকে ত্রিপলি। ছয় মাসে আগে যাত্রা শুরু করি। দালাল ধরে আসি। দালাল বলেছিল যে লিবিয়া থেকে লোকজন আবার ইটালি যাচ্ছে, তুমি কি যেতে চাও? বলেছিল, ওখানে লাইফ অনেক ভালো।

আমি জমি বন্ধক রেখে সাত লাখ টাকা জোগাড় করে এখানে আসি। আমার সঙ্গে আমার মামাতো ভাই এবং খালাতো ভাইও ছিল। ওরা সাগরে মারা গেছে আমার চোখের সামনে।

আমি দক্ষিণ আফ্রিকায় ছিলাম। সেখান থেকে বাংলাদেশে এসে বেকার হয়ে পড়ি। দক্ষিণ আফ্রিকায় থাকতে চাই নি। একদিন আমার চোখের সামনে আমার সামনের দোকানের লোক মারা গেল। ওর দোকানের মাল লুটপাট করে নিয়ে গেল। ভয়ে চলে আসলাম। লাইফে অনেক রিস্ক।

সাগর পাড়ি দিতে যে কোন ঝুঁকি আছে, দালাল আমাদের সেটা বলে নাই। বলেছে, অনেক ভালো সুবিধা, অনেক ভালো লাইন হয়েছে। বলেছে জাহাজে করে একেবারে ইটালিতে পৌঁছে দেবে। কীসের জাহাজ? আমাদের অনেক কষ্ট দিয়েছে। তিন মাস রাখছে একটা রুমে, ৮২ জন বাঙ্গালি। একটা টয়লেট। আমাদের ঠিকমত খেতে দেয় না। তিনদিনে একদিন খাবার দেয়। মারধোর করে। গোসল করি নাই তিন মাস।

আমরা ছিলাম দেড়শো জন লোক। একটি মাছ ধরা ট্রলারে করে আমাদের মধ্য সাগরে নিয়ে যায়। সেখান থেকে ছোট নৌকায় তোলা হয়। দুইটা নৌকা ছিল। একটা নৌকা শুনেছি ইটালি চলে গেছে। একটা নৌকায় তোলা হয়েছিল ৬০ জন। আর আমাদের নৌকায় তুলেছিল ৮০ জনের ওপরে। ছোট নৌকাটি পাঁচ আঙ্গুল পানির উপর ভেসে ছিল। ঢেউ উঠার সঙ্গে সঙ্গে নৌকা উল্টে গেছে। এরপর আমরা সাগরের পানিতে আট ঘন্টা সাঁতার কেটেছি। যে নৌকাটি উল্টে যায়, সেটি ধরে আমরা ভেসে ছিলাম।

আমরা যে আশি জনের মতো ছিলাম, প্রতি পাঁচ মিনিটে যেন একজন করে লোক হারিয়ে যাচ্ছিল। এভাবে একজন একজন করে অনেক লোক হারালাম। আশি জন থেকে আমরা রইলাম আর অল্প কয়েকজন। সকাল হওয়ার পর দেখলাম আমরা মাত্র ১৪/১৫ জন লোক বেঁচে আছি। তখন হঠাৎ দেখি একটা মাছ ধরার ট্রলার। আমাদের মনে হলো আল্লাহ যেন আমাদের জন্য ফেরেশতা পাঠিয়েছে। আর যদি দশ মিনিট দেরি হতো আমরা সবাই মারা যেতাম। আমাদের হাত পা আর চলছিল না।

আমরা সবাই মিলে `হেল্প, হেল্প` বলে চিৎকার করছিলাম। তারপর ওরা এসে আমাদের উদ্ধার করে।

আমি এখন ভাবছি, এখান থেকে দেশে ফিরে গিয়ে কি করবো? দেশে তো অনেক টাকা-পয়সা লোকসান করে এসেছি। পরিবারকে পথে বসিয়ে এসেছি। এখন কোন মুখে দেশে যাব।

মাহফুজ আহমেদ, গোলাপগঞ্জ, সিলেট

ডিসেম্বর মাসের ১২ তারিখে আমি রওনা দেই। বাংলাদেশ থেকে প্রথম দুবাই যাই। সেখান থেকে আম্মান। সেখান থেকে আবার যাই তুরস্ক। তারপর তুরস্ক থেকে লিবিয়ার ত্রিপলি। আমার আপন দুই ভাইও আমার সঙ্গে ছিল। আমরা দালালকে জনপ্রতি নয় লাখ টাকা করে দেই। আমার এই দুই ভাইকে বাঁচাতে পারিনি। ওরা মারা গেছে।

আমরা বুঝতে পারিনি এই পথে এত বিপদ। দালাল বলেছিল, মাছের জাহাজে করে সুন্দরভাবে আমাদের নিয়ে যাবে। আমরা অনেক টাকা খরচ করেছি। তিন ভাই মিলে ২৭ লাখ টাকা। জমি বিক্রি করে, আত্মীয়-স্বজনের কাছে থেকে এই টাকা জোগাড় করি। এখন তো এই ভুলের মাশুল তো আর দিতে পারবো না। এখন আমি দেশে চলে যেতে চাই।

যে দালালের মাধ্যমে আমরা আসি, তাকে আগে থেকে চিনতাম না। সিলেটে সাইফুল নামে এক লোক, সে আমাদের পাঠিয়েছে। বাকী দালালরা লিবিয়ায়। এরা সবাই বাংলাদেশি। এরা লিবিয়ায় থাকে। একজন দালালের নাম রুম্মান। একজনের নাম রুবেল। আরেকজনের নাম রিপন। এদের বাড়ি নোয়াখালি। এই দালালদের সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে। তাদের ক্যাম্পেও আমরা ছিলাম।

সেখানে আরও শ-দেড়শো বাংলাদেশি এখনো আছে। সিলেট, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়ীয়া, মাদারিপুর, ঢাকা- বিভিন্ন জায়গার লোক আছে সেখানে। এদের সঙ্গে আবার অন্যান্য দেশের দালালরাও ছিল। আমার ধারণা, যে পরিস্থিতির শিকার আমরা হয়েছি, কয়েক মাস পর এই বাংলাদেশিরাও সেরকম অবস্থায় পড়বে।

আমি বাংলাদেশ সরকারকে এটা বলতে চাই, আমাদের যেন বাংলাদেশে ফিরিয়ে নেয়। আমাদের যেন দেশে ফিরিয়ে নিয়ে সাহায্য করে।

তথ্যসূত্র: বিবিসি

এমএইচ/


New Bangla Dubbing TV Series Mu
New Bangla Dubbing TV Series Mu

© ২০২০ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি