ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ০৫ মার্চ ২০২৬

সাভারে ভূমিদস্যুদের দৌরাত্ম্য: বিলীনের পথে শত শত একর কৃষিজমি ও জলাশয়

সাভার প্রতিনিধি

প্রকাশিত : ২১:০৭, ৪ মার্চ ২০২৬ | আপডেট: ২১:০৯, ৪ মার্চ ২০২৬

Ekushey Television Ltd.

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষে নতুন সরকার গঠিত হলেও, রাজনৈতিক ব্যস্ততার ফাঁকে সাভারে সক্রিয় হয়ে উঠেছে সংঘবদ্ধ ভূমিদস্যু চক্র।

অভিযোগ রয়েছে—নির্বাচন ও প্রশাসনিক টালমাটাল পরিস্থিতিকে সুযোগ হিসেবে নিয়ে উপজেলার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল, জলাশয়, নদী-নালা, এমনকি সরকারি বনভূমি ভরাট করে অবৈধভাবে গড়ে তোলা হচ্ছে প্লট, ইমারত ও আবাসিক এলাকা। এতে বিলীনের পথে শত শত একর কৃষিজমি ও প্রাকৃতিক জলাধার।

ভুক্তভোগীদের দাবি, প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় এবং স্থানীয় ভূমি অফিসের কিছু অসাধু কর্মকর্তাকে ‘ম্যানেজ’ করেই এ কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে চক্রটি। যদিও সংশ্লিষ্ট দখলদার ও কর্মকর্তারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

সরেজমিনে অনুসন্ধানে জানা যায়, উপজেলার ভাকুর্তা ইউনিয়নের বিলামালিয়া মৌজার আরএস ৩৩৩৭ নম্বর দাগভুক্ত বিস্তীর্ণ জলাশয়ে বালু ভরাট করছেন রিমন মিয়া ও ইমদাদুল হক নামে দুই ব্যক্তি। পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী সরকারি খালও ভরাট করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এ কাজে তাদের পেছনে প্রভাবশালী ব্যক্তি ও ‘রেলিক সিটি’ কেলেঙ্কারির হোতা হিসেবে পরিচিত মো. নূরুজ্জামানের সমর্থন রয়েছে।

এ বিষয়ে মো. নূরুজ্জামানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি সরকারি জমি দখলের অভিযোগ অস্বীকার করেন। জলাশয় ভরাটের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “ভূমি অফিস বিষয়টি জানে।”

বিরুলিয়া ইউনিয়নের আকরাইন মৌজায় মরহুম ইয়াজউদ্দিনের ছেলে ব্যবসায়ী জামাল উদ্দিন অভিযোগ করেন, ওয়ারিশসূত্রে পাওয়া তার জমি দীর্ঘদিন ধরে দখল করে রেখেছে ‘আমিন মোহাম্মদ গ্রুপ’। তিনি বলেন, “নিজের পৈতৃক সম্পত্তিতেও কোনো কাজ করতে পারছি না। বাধা দেওয়া হচ্ছে। অনেকেই জোরপূর্বক জমি হারিয়ে অল্প টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন।”

এ বিষয়ে ‘আমিন মোহাম্মদ গ্রুপ (ল্যান্ড)’–এর ডিজিএম অনুপ কুমার ঘোষ বলেন, “এ ধরনের অভিযোগ অনেকেই করে থাকেন। অভিযোগ থাকলে সামনাসামনি বসে দেখা যেতে পারে। বৈধ জমি হলে আমরা কিনে নিতে পারি।” দখলের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এ ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বলতে পারবে।”

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, পাথালিয়ার সিন্দুরিয়ায় বংশী নদী দখলের অভিযোগ রয়েছে জহিরের বিরুদ্ধে। সালেহপুরে রেজাউল হক জামাল, কমলাপুরে বিলাস চক্র, সাধাপুরে শওকত, মাসুম ও নাসির, মোগড়াকান্দায় মামুন ও রাজীব, রাজফুলবাড়িয়া এলাকায় শফিকুল ইসলাম সাবু ও আনোয়ার হোসেন, গেন্ডা এলাকায় রাজা বাহিনীর প্রধান আবুল হাশেম ওরফে রাজা ও তার সহযোগী জালাল মিয়া—এদের বিরুদ্ধেও দখল ও ভরাটের অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া শিমুলিয়া, নালাম, বিরুলিয়া, আশুলিয়ার তুরাগপাড়, ভাকুর্তা, আমিনবাজার, কাউন্দিয়া, ধামসোনা ও পাথালিয়াসহ পুরো সাভারজুড়ে শতাধিক প্রভাবশালী ভূমিদস্যু সক্রিয় বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

ভূমিদস্যুদের প্রতিরোধ করতে গিয়ে বিভিন্ন সময় হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। গত বছরের ১৭ মে বন বিভাগের জমি দখলে বাধা দিতে গিয়ে বন কর্মকর্তা মহিদুর ইসলামসহ পাঁচজন আহত হন। এর আগেও একাধিক সংঘর্ষ ও মামলার ঘটনা রয়েছে। কিছু গ্রেপ্তার হলেও অভিযোগ অনুযায়ী স্থায়ী সমাধান আসেনি। কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ একাধিকবার বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও স্মারকলিপি প্রদান করেছেন। তবুও দখল ও ভরাট বন্ধ হয়নি বলে অভিযোগ।

সাভার উপজেলা ভূমি অফিসের কানুনগো জিয়া উদ্দিন বলেন, “আমাদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ অমূলক ও ভিত্তিহীন।” নির্দিষ্ট জমির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এসব বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলতে পারবেন।”

উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আব্দুল্লাহ আল-আমীন বলেন, “জলাশয় দখল, জমির শ্রেণি পরিবর্তন ও সরকারি জমি দখলের অভিযোগ পেলেই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ইতোমধ্যে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে।” তবে স্থায়ী সমাধান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আইনের মধ্যে থেকে আমরা দায়িত্ব পালন করি। সংশ্লিষ্ট সবার সম্মিলিত উদ্যোগ হলে স্থায়ী সমাধান সম্ভব।”

ঢাকা-১৯ (সাভার) আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ডা. দেওয়ান মো. সালাউদ্দিন বাবু বলেন, “ভূমিদস্যু দমন আমার নির্বাচনী অঙ্গীকারের অন্যতম বিষয়। কোনো দখলবাজকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। সাভারকে দখলমুক্ত করতে সর্বোচ্চ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এমআর// 


Ekushey Television Ltd.

© ২০২৬ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি