ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শিশু রায়হানের পা কাটা: ভিক্ষাবৃত্তির অভিযোগের সঙ্গে মিলছে না ট্রেন দুর্ঘটনার তথ্য

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ১৬:৫৫, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ১৬:৫৭, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

Ekushey Television Ltd.

চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার ১২ বছরের শিশু মো. রায়হানের একটি পা কেটে ফেলার ঘটনাকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা অভিযোগ ছড়িয়ে পড়েছিল। তাকে ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য করতেই রাজধানীর একটি চক্র পা কেটে দিয়েছে এমন দাবিও করা হয়। তবে পুলিশ ও সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, ট্রেন দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হওয়ার পর চিকিৎসার প্রয়োজনেই রায়হানের পা কেটে ফেলতে হয়েছিল।

চুনতি ইউনিয়নের সাতগড় নোয়াপাড়ার বাসিন্দা রায়হান প্রায় সাত মাস আগে বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়। পরে ১৩ সেপ্টেম্বর ভোরে স্থানীয় একটি সিরাত মাহফিলের মাঠে তাকে ভিক্ষা করতে দেখা যায়। খবর পেয়ে পরিবারের সদস্যরা সেখানে গিয়ে তাকে শনাক্ত করেন।

এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রায়হানের পা কাটা অবস্থার ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। এসব পোস্টে দাবি করা হয়, রাজধানীতে একটি সংঘবদ্ধ চক্র শিশুটিকে আটকে রেখে ভিক্ষা করানোর জন্য তার পা কেটে দিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়।

তবে ঢাকা রেলওয়ে থানার এক পুলিশ কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, রায়হান গত ১১ জুন ঢাকার বিমানবন্দর এলাকা থেকে গোসল করে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে ফেরার পথে কর্ণফুলী এক্সপ্রেস ট্রেনের দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়। তখন পুলিশ তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে।

প্রথমে তাকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকদের সিদ্ধান্তে ২ জুলাই রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতালে অস্ত্রোপচার করে তার একটি পা কেটে ফেলতে হয়। অস্ত্রোপচারের পর তাকে আইসিইউতে রাখা হয়েছিল। মাথায় আঘাতের চিকিৎসার জন্য পরে তাকে জাতীয় নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালে নেওয়া হয়।

পুলিশের ওই কর্মকর্তার ভাষ্য, হাসপাতালে প্রায় দেড় মাস চিকিৎসাধীন ছিল রায়হান। এ সময় সমাজসেবা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে তার দেখাশোনার জন্য আরেছা নামের এক আয়াকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

হাসপাতাল থেকে ছাড় পাওয়ার পর রায়হান কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে ফিরে যায়। সেখানে জরিনা নামে এক নারীর কাছে আশ্রয় নেয়, যিনি স্টেশনে ‘মালির মা’ নামে পরিচিত ছিলেন। এরপর স্টেশনেই ভিক্ষা করত সে।

পুলিশ জানিয়েছে, রায়হান কমলাপুরে আল আমিন নামে এক যুবকের সঙ্গে লাভ ভাগাভাগির ভিত্তিতে পানি বিক্রি করত। পাশাপাশি ভিক্ষাও করত।

একপর্যায়ে রায়হান বাড়িতে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করে। সে তার মা মারা গেছেন বলেও জানিয়েছিল বলে পুলিশ জানায়। পরে তার বন্ধু জাকির তাকে যাত্রাবাড়ীতে নিয়ে গিয়ে একটি বাসে তুলে দেয়।

রায়হানকে বাড়ি ফেরাতে রেলওয়ে পুলিশের কনস্টেবল রিয়াজুল করিমও সহযোগিতা করেছিলেন বলে পুলিশ কর্মকর্তার দাবি। স্টেশনের মিনা নামের আরেক নারীও শিশুটির প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওই নারীসহ কয়েকজনকে ঘটনাটির সঙ্গে জড়িত হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে বলে দাবি পুলিশের।

রায়হান আহত হওয়ার পর একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে হাসপাতালের মেঝেতে বসা অবস্থায় শিশুটিকে দেখা যায়। ভিডিওতে সে জানায়, ট্রেনের ছাদ থেকে পড়ে গিয়ে আহত হয়েছে। সে তার মা-বাবা নেই বলেও জানিয়েছিল।

রায়হানের বাড়ি চুনতির সাতগড় নোয়াপাড়ায়। তার বাবা নাজিম উদ্দীন দিনমজুর। রায়হানের মায়ের সঙ্গে তার বিচ্ছেদ হয়েছে এবং বর্তমানে তারা আলাদা সংসারে থাকেন। বাড়ি ছাড়ার আগে রায়হান সৎমায়ের সঙ্গে থাকত। স্থানীয় একটি হেফজখানায় পড়াশোনাও করত সে।

রায়হানের পা কাটা অবস্থার ছবি ছড়িয়ে পড়ার পর পরিবারের পক্ষ থেকে রাজধানীর কোনো চক্র তাকে ধরে নিয়ে পা কেটে দিয়েছে—এমন অভিযোগ সামনে আসে। কিন্তু রায়হান, তার মা-বাবা ও সৎমায়ের বক্তব্য পর্যালোচনা করে ঘটনাটির বিভিন্ন পর্যায়ে তথ্যের অমিল পাওয়া যায়।

রায়হানের মা মারা গেছেন—এমন তথ্যও বিভিন্ন সময় ছড়িয়েছে। কিন্তু বাড়িতে গিয়ে তার আপন মা ও সৎমা—দুজনের সঙ্গেই কথা বলার সুযোগ পাওয়া গেছে। ফলে শিশুটির পারিবারিক পরিস্থিতি এবং সে কেন বাড়ি থেকে চলে গিয়েছিল, তা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা আবুল হোসেন রায়হানের বাবা নাজিম উদ্দীনকে নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ করেন। তার দাবি, নাজিম উদ্দীন মাদক সেবন করেন এবং ছেলের পা কাটার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পরও তাকে দেখতে যাননি। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি।

অন্যদিকে বিভিন্ন গণমাধ্যমে নাজিম উদ্দীন দাবি করেছেন, ছেলেকে উদ্ধারের পর তিনি তার পা কাটা অবস্থায় দেখেছেন এবং এর আগে বিষয়টি সম্পর্কে জানতেন না। তার বক্তব্যের বিভিন্ন অংশে সময় ও ঘটনার বিবরণেও ভিন্নতা পাওয়া গেছে।

লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বায়েজিদ-বিন-আখন্দ জানিয়েছেন, রায়হানের বিষয়ে জানার পর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে সহযোগিতা করা হয়েছে। তবে ঘটনাটি নিয়ে বিভিন্ন ধরনের তথ্য সামনে আসায় বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

রায়হান কেন বাড়ি থেকে চলে গিয়েছিল, ঢাকায় কার সঙ্গে গিয়েছিল, সেখানে কীভাবে থাকত এবং দুর্ঘটনার আগে ও পরে কারা তার সঙ্গে ছিল এসব প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি।

এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য করার উদ্দেশ্যে রায়হানের পা কেটে দেওয়া হয়েছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এই দাবির সঙ্গে ট্রেন দুর্ঘটনা ও তার চিকিৎসার যে তথ্য পাওয়া গেছে, তা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তবে শিশুটির দীর্ঘ সময় নিখোঁজ থাকা এবং ঢাকায় তার অবস্থানকালের ঘটনাগুলো নিয়ে আরও অনুসন্ধান প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। 

এমএইচ 
 


Ekushey Television Ltd.

© ২০২৬ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি