ঢাকা, বুধবার   ১১ ডিসেম্বর ২০১৯, || অগ্রাহায়ণ ২৭ ১৪২৬

Ekushey Television Ltd.

পর্যটকদের চাহিদা মেটাতে ‘গ্রীষ্মকালীন স্ত্রী’!

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ২০:২১ ১৮ নভেম্বর ২০১৯ | আপডেট: ২০:২৩ ১৮ নভেম্বর ২০১৯

মিশরের পর্যটন কেন্দ্র

মিশরের পর্যটন কেন্দ্র

শিরোনাম দেখে খটকা লাগলো, তাইনা? ভাবছেন, গ্রীষ্মকালীন আবার স্ত্রী হয় নাকি! হ্যাঁ হয়, হচ্ছেও বটে। অর্থের লোভ দেখিয়ে মিশরের শত শত কিশোরীকে ধনী পর্যটকদের ‘সাময়িক স্ত্রী’ হতে বাধ্য করা হচ্ছে। আরব লাগোয়া আফ্রিকান দেশটিতে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক নিষিদ্ধ হওয়ায় পর্যটকদের যৌন চাহিদা মেটাতে চলছে এমন কাণ্ড। যেখানে ওই কিশোরীদের পরিচয় ‍Summer bride বা ‘গ্রীষ্মকালীন স্ত্রী’ হিসেবে।

এমনই বেশ কয়েকটি ঘটনা সম্প্রতি প্রকাশ পায় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে। তারমধ্যে একটি হলো- ২০০৮ সালের গ্রীষ্মকালের ঘটনা। মিসরীয় কন্যা হুরাইরার (ছদ্মনাম) বয়স তখন মাত্র ১৫ বছর। দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ শুনে বাইরে এসে এক পুরুষকে তার বাবা ও সৎ মায়ের সঙ্গে কথা বলতে দেখেন হুরাইরা। তার সামনেই হলো সব কথাবার্তা। মাত্র ১,৭৫০ ইউরো (প্রায় ১ লাখ ৬৩ হাজার টাকা) ‘মোহরানা’র বিনিময়ে সৌদি আরব থেকে আসা সেই ব্যক্তিকে তার বিয়ে করতে হবে।

মাত্র ২০ দিন মেয়াদী সেই বিয়েতে ক্রমাগত ধর্ষণের শিকার হতে হয় হুরাইরাকে। এরপর গ্রীষ্মকালীন ছুটি শেষ। হুরাইরাকে তার বাবা-মায়ের কাছে ফেরত দিয়ে সৌদি নাগরিক ফেরত চলে যান নিজ দেশে। আর কখনও সে ব্যক্তির সঙ্গে দেখা হয়নি হুরাইরার।

ডয়চে ভেলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিশরে যৌনকর্মীদের ডাক নাম ‘গ্রীষ্মকালীন স্ত্রী’। হুরাইরাও ছিলেন তাদেরই একজন। প্রতি বছরই উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশ থেকে এমন ‘স্ত্রী’ বেছে নিতে মিশরে আসেন পর্যটকরা। এর বিনিময়ে মেয়ের পরিবারকে যে অর্থ দেয়া হয়, তা তাদের জন্য অনেক কিছু।

হুরাইরা বলছিলেন, ‘সব কিছু খুব লোভনীয় লাগছিল। আমার পরিবার আমাকে নতুন কাপড় আর উপহারের লোভ দেখায়। আমি তখন খুব ছোট ছিলাম। শেষ পর্যন্ত আমি রাজী হয়ে যাই।’ হুরাইরার পরিবার তার বিয়ের ‘যৌতুকের’ টাকা দিয়ে একটি ফ্রিজ আর ওয়াশিং মেশিন কিনে ফেলে।

হুরাইরার বয়স এখন ২৮। এর মধ্যে তার ৮ বার বিয়ে হয়েছে তার। প্রতিবারই অল্প কিছু দিনের জন্য। নিজের অতীত নিয়ে তিনি লজ্জিত এবং নিজের আসল নামও প্রকাশ করতে চান না তিনি। বাইরে বের হলে নিজেকে সব সময় আড়াল করে রাখেন কালো নেকাবে।

প্রথম বিয়ের সময় রাজধানী কায়রো থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে অউসিম গ্রামে ছোট এক বাড়িতে বাবা, সৎ মা এবং ছয় সৎ ভাই-বোনের সঙ্গে থাকতেন হুরাইরা।

কিন্তু তখন হুরাইরা যেমনটা ভেবেছিলেন স্বপ্ন দেখেছিলেন, খুব দ্রুত সে সব স্বপ্ন মিথ্যা প্রমাণ হতে থাকে। তিনি বলেন, ‘আমি তখন খুব সহজ সরল ছিলাম, ভালোবাসায় বিশ্বাস করতাম। বিয়ের প্রথম রাত খুব ভয়াবহ ছিল। এর পর থেকে আমি মানসিক সমস্যায় ভুগি।’

কিন্তু এসব জানিয়েও পরিবারকে পরের বিয়েগুলোর আয়োজন করা থেকে ঠেকানো যায়নি। পরের গ্রীষ্মেই আবার এক পর্যটককে বিয়ে করতে হয় হুরাইরার। এবার তার ‘স্বামী’ একজন কুয়েতি। কুমারী না হওয়ায় এবার তার ‘যৌতুক’ কেবল ৬০০ ইউরো।

মিশরে যৌনকর্মী ও মানবপাচার নিয়ে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে কাজ করেন আইনজীবী আহমেদ মোসেলহি। হুরাইরার গল্প মিশরে জন্য নতুন কিছু নয় বলে মনে করেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘অনেক মেয়ে পরিবারকে সাহায্য করতে চায়। এ জন্য অনেকে স্বেচ্ছায় এসব বিয়েতে রাজী হয়। টাকা আসতে থাকলে এক পর্যায়ে তাতে আসক্তি তৈরি হয়।'

এরপর তিনি জানালেন ভয়াবহ এক পরিসংখ্যান। কায়রোর আশপাশের এলাকাগুলোতেই একেকটি পরিবারে আট বা তারও বেশি সন্তান রয়েছে। প্রতিটি মেয়েই এমন ‘গ্রীষ্মকালীন বিয়ের’ মাধ্যমে একটি গাড়ি অথবা বাড়ির একটি তলা বানানোর সমান অর্থ আয় করতে সক্ষম হয়।
 
কায়রোর আশপাশের এলাকায় মূলত দরিদ্র লোকেদের বাস। যাদের চার ভাগের এক ভাগ মানুষকে দিনে দুই ডলারেরও (প্রায় ১৫০ টাকা) কম খরচে চলতে হয়। সেক্স ট্যুরিজম এই চরম দরিদ্রদের জীবনে নতুন আশা সৃষ্টি করছে। পর্যটকদের কেউ কেউ তো মেয়ের কুমারীত্ব, বয়স, চেহারা এবং বিয়ের স্থায়িত্ব বিবেচনা করে এক লাখ ইউরো (প্রায় ৯৫ লাখ টাকা) পর্যন্ত খরচ করতে রাজী হয়।

এসব বিয়েতে হোটেল কক্ষ বা অ্যাপার্টমেন্টসহ নানা প্যাকেজও রয়েছে। অন্যদিকে এই বিয়ের সমর্থনে যুক্তি হিসেবে বলা হয়, এর মাধ্যমে একদিকে কাগজ-কলমে ‘বৈধ’ বিয়েতে স্বামী-স্ত্রীর ধর্মীয় বিধানও অমান্য হয় না, দেশের আইনেও বিচার করাটা বেশ কঠিন হয়।

তবে, হুরাইরা এখন আর এই ব্যবসায় জড়িত নন। যদিও এখনও তিনি তার বাবা ও সৎ মায়ের সঙ্গেই বাস করেন। তিনি বলেন, ‘আমি আর তাদের ভয় করি না কিন্তু প্রচণ্ড ঘৃণা করি, বিশেষ করে আমার বাবাকে। তিনি কীভাবে এসব হতে দিলেন!’

এখন সত্যিকার একটি বিয়ের জন্য সঠিক মানুষের সন্ধান করছেন হুরাইরা। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, হুরাইরার ভাগ্যে কী হবে তা প্রায় নিশ্চিত। কেননা, হুরাইরার মতো ‘গ্রীষ্মকালীন স্ত্রী’দের সমাজে সম্মানের চোখে দেখা হয় না। মিশরের রক্ষণশীল সমাজে কোনও পুরুষই এমন মেয়েকে বিয়ের যোগ্য মনে করে না।

এনএস/

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি