চুল কাটতে বেরিয়ে সাত মাস পর ফিরল রায়হান, নেই এক পা
প্রকাশিত : ২২:৪৬, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মাত্র ১০০ টাকা নিয়ে চুল কাটার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল ১২ বছরের শিশু মোহাম্মদ রায়হান। এরপর কেটে যায় প্রায় সাত মাস। দীর্ঘ সময় পর বাড়ি ফিরলেও আগের সেই সুস্থ-স্বাভাবিক শিশুটি আর নেই। তার ডান পা কাটা, শরীরে অস্ত্রোপচারের দাগ। পরিবারের অভিযোগ, ঢাকায় নিয়ে তাকে ভিক্ষাবৃত্তিতে ব্যবহার করা হয়েছে। তার একটি কিডনিও অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অপসারণ করা হয়ে থাকতে পারে বলে পরিবারের সন্দেহ রয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে সত্যতা উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন তারা।
রায়হান চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি ইউনিয়নের সাতগড় নোয়াপাড়া এলাকার অটোরিকশাচালক নাজিম উদ্দিনের ছেলে। গত সাত মাস আগে বাড়ি থেকে বেরিয়ে নিখোঁজ হওয়ার পর ১৩ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ১২টার দিকে চুনতি সীরাত মাহফিল এলাকায় তাকে দেখতে পান স্থানীয়রা। এক পায়ে ভর করে ভিক্ষা করছিল শিশুটি। পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর খবর দেওয়া হয় তার পরিবারকে। পরে বাবা গিয়ে তাকে বাড়িতে নিয়ে আসেন।
রায়হানের ভাষ্য অনুযায়ী, চুল কাটার জন্য বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর সে কক্সবাজারে চলে যায়। সেখানে কয়েকজন কিশোরের সঙ্গে পরিচয় হয়। তাদের সঙ্গে ট্রেনের ছাদে করে সে ঢাকায় আসে। পরে কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে কয়েকজন তাকে এমন একটি স্থানে নিয়ে যায়, যেখানে চারপাশে বাগান এবং মাঝখানে একটি ঘর ছিল। সেখানে আরও কয়েকজন শিশু ছিল বলে জানায় রায়হান।
শিশুটির দাবি, এক রাতে সেখানে ঘুমানোর পর সকালে উঠে সে দেখতে পায় তার একটি পা নেই। কীভাবে পা হারাল জানতে চাইলে তাকে বলা হয়, ট্রেন দুর্ঘটনায় সে আহত হয়েছে। এরপর তাকে হুইলচেয়ারে বসিয়ে নিয়মিত ভিক্ষা করানো হতো। ভিক্ষা থেকে পাওয়া টাকা একটি প্লাস্টিকের ব্যাংকে জমা রাখা হতো বলেও জানায় সে।
রায়হান আরও জানায়, ওই স্থানে দুজন পুরুষ ও সালমা নামে এক নারী ছিল। সেখানে থাকা আরও কয়েকজনের হাত-পা কাটা অবস্থায় ছিল বলেও তার দাবি। পরে তাকে বাসে তুলে দেওয়া হলে সে চুনতির সীরাত মাহফিল এলাকায় চলে আসে।
রায়হানের বাবা নাজিম উদ্দিন বলেন, তার ছেলে হেফজখানায় পড়াশোনা করত। দুষ্টুমি করায় মাঝেমধ্যে তাকে পানের ক্ষেতে কাজে নিয়ে যেতেন। ঘটনার দিন চুল কাটার জন্য ১০০ টাকা দিয়ে তাকে বাড়ি থেকে পাঠিয়েছিলেন। পরে ছেলে নিখোঁজ হয়ে যায়।
নাজিম উদ্দিনের অভিযোগ, ছেলেকে ঢাকায় নেওয়ার পর তার একটি পা কেটে ভিক্ষাবৃত্তিতে নামানো হয়েছে। সন্তানকে উদ্ধারের পর তিনি থানায় যোগাযোগ করলেও অভিযোগ গ্রহণ করা হয়নি বলে দাবি করেন। তার ভাষ্য, পুলিশ ঘটনাটি ঢাকার কমলাপুর এলাকার হওয়ায় সংশ্লিষ্ট থানায় যোগাযোগের পরামর্শ দেয়। দরিদ্র হওয়ায় ঢাকায় গিয়ে মামলা বা অভিযোগ করার সামর্থ্য তার নেই বলেও জানান তিনি।
রায়হানের সৎমা ফয়জুন্নেসা বলেন, সাত মাস পর সন্তানকে ফিরে পেলেও তাকে দেখে পরিবার ভেঙে পড়েছে। তার এক পা নেই এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে অস্ত্রোপচারের চিহ্ন রয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করে কঠোর শাস্তির দাবি জানান তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দা নুরুন্নবী জানান, রাতের দিকে মাহফিলের ভিড়ে এক পায়ে ভর করে একটি শিশুকে ভিক্ষা করতে দেখে তার পরিচিত মনে হয়। কাছে গিয়ে নাম জানতে চাইলে শিশুটি কান্নাজড়িত কণ্ঠে নিজের পরিচয় দেয়। পরে তিনি রায়হানের বাবাকে ফোন করে বিষয়টি জানান।
স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. তৈয়ুবুল্লাহ বলেন, রায়হানের পরিবার অত্যন্ত অসচ্ছল। শিশুটির সঙ্গে এমন ঘটনা ঘটে থাকলে এটি অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ। দ্রুত তদন্ত করে জড়িতদের শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
মানবাধিকারকর্মী দেলোয়ার হোসেন রশিদীও ঘটনাটির সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন। তার মতে, শিশুটির বক্তব্যে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন।
তবে পরিবার থানায় অভিযোগ না করার বিষয়টি উল্লেখ করেছে পুলিশ। লোহাগাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুল্লাহ এবং পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) প্রশান্ত কুমার ভৌমিক জানান, রায়হান সাত মাস আগে নিখোঁজ হলেও তার পরিবার তখন থানায় কোনো জিডি বা অভিযোগ করেনি।
তদন্ত কর্মকর্তা প্রশান্ত কুমার ভৌমিক বলেন, পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রায়হান কিছুদিন কক্সবাজারে থাকার পর ঢাকার কমলাপুরে গিয়েছিল। তাই সংশ্লিষ্ট থানায় যোগাযোগের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে রায়হান নিখোঁজ থাকার সময় কমলাপুর রেলস্টেশনে এক কনটেন্ট ক্রিয়েটর তার ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছিলেন। ভিডিওতে শিশুটিকে বলতে দেখা যায়, পারিবারিক বিরোধের কারণে সে বাড়ি ছেড়ে ঢাকায় এসেছে। তবে পরিবারের দাবি, ভয় দেখিয়ে বা অন্য কারও শেখানো কথায় শিশুটি ওই বক্তব্য দিয়ে থাকতে পারে।
বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের মহাসচিব অ্যাডভোকেট জিয়া হাবীব আহসান ঘটনাটিকে উদ্বেগজনক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি দাবি করেন, দেশে বিপুলসংখ্যক শিশু নিখোঁজ হচ্ছে এবং এসব ঘটনার পেছনে শিশু পাচার, ভিক্ষাবৃত্তি কিংবা অঙ্গ পাচারকারী চক্রের সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে শিশু নিখোঁজের ঘটনায় ১৫ হাজার ৭১৭টি জিডি হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ শিশুকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও ২ হাজার ৩৮ জন এখনও নিখোঁজ রয়েছে বলে সংগঠনটি জানিয়েছে।
বিএইচআএফ চেয়ারপার্সন অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, নিখোঁজ শিশুদের ঘটনাগুলোকে আলাদা আলাদা ঘটনা হিসেবে দেখলে চলবে না। শিশু পাচার, ভিক্ষাবৃত্তি ও অঙ্গ পাচারের সম্ভাবনাও তদন্তের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে নিখোঁজ শিশুদের দ্রুত শনাক্তে জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত ডাটাবেজ ও জরুরি সতর্কতা ব্যবস্থা চালুর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
রায়হানের ঘটনায় তার পরিবারের প্রধান দাবি—শিশুটির নিখোঁজ হওয়া থেকে শুরু করে পা হারানো এবং শরীরে অস্ত্রোপচারের দাগের প্রকৃত কারণ নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বের করা হোক। একই সঙ্গে কোনো সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র জড়িত থাকলে তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে পরিবার।
এমএইচ
আরও পড়ুন










