ঢাকা, শুক্রবার   ২৮ আগস্ট ২০২৬

নেপালে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৪৬৯

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ১৪:৩৯, ২৮ আগস্ট ২০২৬

Ekushey Television Ltd.

নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৪৬৯ জনে দাঁড়িয়েছে। সীমান্তের দুই পাশে এখনো ১ হাজার ৪৬৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। এর মধ্যে নতুন করে তৈরি হওয়া একটি বাধা হ্রদ ভেঙে পড়লে আবারও প্রবল পানির স্রোত নেমে আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

শুক্রবার (২৮ আগস্ট) ভোরের দিকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে নেপাল পুলিশ। পুলিশ কর্মকর্তরা আরও বলেছেন, নিখোঁজদের মধ্যে অন্তত ৫৪০ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন বলে ধারণা করছেন তারা।

হিমবাহ ধসের পর বরফ ও পাথরের তুষারধস থেকে এই বন্যার সূত্রপাত হয়। নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে সৃষ্ট এই ধসের পর পানি, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের প্রবল স্রোত মধ্য নেপালের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে আঘাত হানে। এতে বাড়িঘর, যানবাহন, সড়ক ও সেতু ভেসে যায়। রাসুয়া ও নুয়াকোটের বেশ কয়েকটি জনবসতি পুরু কাদা ও ধ্বংসাবশেষের নিচে চাপা পড়েছে।

ভোতে কোশি নদী ব্যবস্থায় পানির প্রবাহ নিচের দিকে যাওয়ার সময় কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বেশ কয়েকটি গ্রাম। সড়ক ও সেতু ভেসে যাওয়ায় দুর্গম এলাকায় আটকে পড়া মানুষের কাছে পৌঁছাতে উদ্ধারকারীদের সমস্যা হচ্ছে। বাড়িঘর, বাজার, খামার ও সরকারি ভবন কাদা ও ধ্বংসাবশেষের নিচে হারিয়ে গেছে।

উদ্ধারকারীরা নদীর তীর ও বিচ্ছিন্ন জনপদে জীবিতদের খোঁজ এবং পানির স্রোতে ভেসে যাওয়া মরদেহ উদ্ধারে কাজ করছেন। তবে দুর্যোগের ঝুঁকি এখনও কাটেনি। ভোতে কোশি নদী ব্যবস্থার উৎসের কাছে নতুন করে তৈরি হওয়া একটি বাধা হ্রদ ভেঙে গেলে আরও বড় পানির ঢল নামতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

নেপাল পুলিশ জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা থেকে হেলিকপ্টারে ৭৯৬ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৫০ জন বিদেশি নাগরিক। তবে বিদেশিদের জাতীয়তা জানানো হয়নি। এ ছাড়া স্থলপথে আরও সরিয়ে নেয়া হয়েছে ৭৯৬ জনকে। উদ্ধার হওয়া পর্যটকদের কাঠমান্ডুতে আকাশপথে নিয়ে গেছে নেপাল সেনাবাহিনী।

নেপালের কর্তৃপক্ষ ৯১০ জন নিখোঁজ থাকার তথ্য জানিয়েছে। তিব্বতের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সেখানে আরও ৫৫৮ জনের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে সীমান্তের দুই পাশে মোট নিখোঁজের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৬৮। হেলিকপ্টার, ড্রোন ও স্থলভিত্তিক উদ্ধারকারী দল বিচ্ছিন্ন জনপদ, নদীর তীর ও নিম্নাঞ্চলে অনুসন্ধান চালাচ্ছে।

নেপাল পুলিশ জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোর মধ্যে চিতওয়ান থেকে সবচেয়ে বেশি ১৩৭টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। রাসুয়া, নুয়াকোট, ধাদিং, গোরখা, তানাহুন ও নাওয়ালপরাসি থেকেও মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নিখোঁজদের মধ্যে নেপাল সেনাবাহিনীর অন্তত ৪৪ জন, নেপাল পুলিশের ২৮ জন এবং সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর ১৩ জন সদস্য রয়েছেন। এ ছাড়া জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ও শুল্ক দপ্তরে কাজ করা প্রায় ১৬০ জনও নিখোঁজ রয়েছেন।

দুর্যোগের পর ভারতও বড় ধরনের উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নেপালে থাকা ২৯০ জন ভারতীয় নাগরিকের সঙ্গে এখনও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তাদের অবস্থান শনাক্ত ও উদ্ধারের জন্য জরুরি প্রচেষ্টা চালাচ্ছে নয়াদিল্লি। নিখোঁজ ভারতীয়দের মধ্যে বিভিন্ন রাজ্যের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কর্মী এবং পর্যটক দল রয়েছে।

দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত বেশির ভাগ ভারতীয় পর্যটক তিব্বতের কৈলাশ মানস সরোবর অথবা নেপালের বাগমতী প্রদেশের গোসাইকুণ্ডের দিকে যাচ্ছিলেন। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে দিল্লি-কাঠমান্ডু বাস চলাচলও স্থগিত করা হয়েছে। এদিকে ত্রিশুলি-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ৬৩ জন ভারতীয় নাগরিককে।

নেপাল সেনাবাহিনী ত্রিশুলি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি সুড়ঙ্গে আটকে থাকা প্রায় ৩৫০ জন শ্রমিক ও কর্মীকেও উদ্ধার করেছে। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন ভারতীয় কর্মী ছিলেন। উদ্ধার অভিযান চলার পাশাপাশি নেপালকে মানবিক সহায়তা বাড়িয়েছে ভারত। বুধবার ১০ টন মানবিক সহায়তা ও দুর্যোগ মোকাবিলা সামগ্রী পাঠানোর পর বৃহস্পতিবার সামরিক পরিবহন বিমানে আরও ৩৭ দশমিক ৫ টন ত্রাণ পাঠানো হয়েছে। এতে নেপালে পাঠানো মোট ত্রাণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৭ দশমিক ৫ টন।

উদ্ধারকারীরা যখন জীবিতদের খুঁজছেন, তখন নতুন এক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে ভোতে কোশি নদী ব্যবস্থার উৎসের কাছে গড়ে ওঠা একটি বাধা হ্রদকে ঘিরে। চীনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত হ্রদটিতে প্রায় ২০ লাখ ঘনমিটার পানি জমেছিল। আগামী তিন দিনে আরও ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি সেখানে জমতে পারে। এতে প্রাকৃতিক বাধা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ছোচেন খোলা ও পুরেপু স্যাংপো নদীর মিলনস্থলের কাছে হ্রদটি তৈরি হয়েছে। এসব নদীর উৎপত্তি তিব্বতে এবং পরে এগুলো নেপালে ভোতে কোশি নদী ব্যবস্থার অংশ হিসেবে প্রবাহিত হয়েছে। নেপালের জলবিদ্যা ও আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, চীনা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তারা হ্রদটির বিষয়ে তথ্য পেয়েছে। ভোতে কোশি ও ত্রিশুলি নদী এলাকায় বন্যার ঝুঁকি এখনও রয়েছে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে মানুষকে নদীর তীর থেকে দূরে থাকতে এবং নিরাপদ স্থানে অবস্থান করতে বলা হয়েছে। পর্যটক, নিরাপত্তাকর্মী এবং উদ্ধার ও অনুসন্ধানকারী দলগুলোকেও সতর্ক থাকার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। চীনা কর্তৃপক্ষ হ্রদটির ওপর নজরদারি চালাচ্ছে এবং বন্যার সম্ভাব্য পরিস্থিতি ও ঝুঁকি মূল্যায়ন করছে। যোগাযোগ ও শনাক্তকরণ সরঞ্জাম নিয়ে একটি চীনা উদ্ধারকারী দলও উজানের বাধা পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য জিরংয়ে পৌঁছেছে। কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, বাধা হ্রদটি ভেঙে পড়লে দ্বিতীয় দফায় বড় ধরনের দুর্যোগ তৈরি হতে পারে এবং আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে চলমান উদ্ধার অভিযান।

এমএইচ


Ekushey Television Ltd.

© ২০২৬ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি