প্রবৃদ্ধির সুফল মানুষের কল্যাণে পৌঁছাতে হবে: গবেষণা সিম্পোজিয়ামে
প্রকাশিত : ১৮:১৩, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি শুধু প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান দিয়ে বিচার না করে মানুষের জীবনে এর কী ধরনের পরিবর্তন আসছে, সেটিকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন গবেষক, অর্থনীতিবিদ ও নীতিবিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, বৈষম্য কমানো ও জনকল্যাণে কাজে লাগানো জরুরি।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) ঢাকার একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত ‘সৈয়দ হুমায়ুন কবির মেমোরিয়াল রিসার্চ সিম্পোজিয়াম ২০২৬’-এ বক্তারা এসব কথা বলেন। ‘ন্যায়বিচার, সক্ষমতা ও জনকল্যাণ: একটি অধিকতর ন্যায়পরায়ণ বাংলাদেশের জন্য মানব উন্নয়নকে নতুন করে ভাবা’ প্রতিপাদ্যে দিনব্যাপী এ আয়োজন করে সাজেদা ফাউন্ডেশন। সহযোগিতায় ছিল বাংলার পাঠশালা ফাউন্ডেশন।
সিম্পোজিয়ামে ভার্চুয়ালি মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ও বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসু। তিনি বলেন, কোনো দেশের অগ্রগতি শুধু জিডিপির প্রবৃদ্ধি দিয়ে পরিমাপ করা যথেষ্ট নয়; সেই অগ্রগতি কীভাবে মানুষের মঙ্গলে রূপ নিচ্ছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
কৌশিক বসুর মতে, ন্যায়বিচার, সমতা, আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে পারলে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশ ভবিষ্যতে নতুন ধরনের বৈষম্য তৈরি করতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন। ফলে অর্থনৈতিক অগ্রগতির সুফল সমাজের কোন অংশ কতটা পাচ্ছে, সে বিষয়ে নজর দেওয়া প্রয়োজন।
সিম্পোজিয়ামে বক্তারা তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে নীতি প্রণয়ন এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁদের আলোচনায় স্বাস্থ্য, জীবিকা, নগর-সহনশীলতা, জলবায়ু অভিযোজন, সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক মানোন্নয়নের মতো বিষয় উঠে আসে।
সাজেদা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ফারুক সোবহান বলেন, নেতৃত্ব, জবাবদিহি এবং ফলাফলভিত্তিক ও মেধানির্ভর কাঠামো তৈরি হলে প্রতিষ্ঠান জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারে।
সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইদুজ্জামান সরকারি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মান বাড়ানোর জন্য সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। তাঁর মতে, সরকারি সেবার মানোন্নয়নে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ।
সাজেদা ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জাহিদা ফিজ্জা কবির বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে কীভাবে মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানো যায় এবং একই সময়ে বৈষম্য বাড়ছে কি না—এসব প্রশ্ন ভবিষ্যৎ কার্যক্রমের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেবে।
সিম্পোজিয়ামের একটি অধিবেশনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও বাংলাদেশের প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা হয়। ওই অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক আইনুন নিশাত। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনকে শুধু ভবিষ্যতের সমস্যা হিসেবে দেখলে হবে না; এর সম্ভাব্য প্রভাব আগেই নিরূপণ করে প্রস্তুতি নিতে হবে। বাংলাদেশের নীতি ও পরিকল্পনায় জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয় থাকলেও বাস্তবায়নে ঘাটতি রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানে গবেষণার সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তব কাজের সংযোগ তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে আসে। সাজেদা ফাউন্ডেশনের জ্যেষ্ঠ গবেষণা উপদেষ্টা ড. সাজেদা আমিন বলেন, ভালো গবেষণা করার পাশাপাশি গবেষণার ফলাফল যথাযথভাবে উপস্থাপন ও মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
বিভিন্ন অধিবেশনে সুশাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, প্রতিষ্ঠান ও উদ্ভাবন, স্বাস্থ্য ও জীবিকা, নগর-সহনশীলতা এবং জলবায়ু অভিযোজন নিয়ে গবেষণার ফলাফল ও মতামত উপস্থাপন করেন গবেষক, শিক্ষাবিদ, নীতিনির্ধারক ও উন্নয়নকর্মীরা।
আলোচনাগুলোতে অধ্যাপক অমর্ত্য সেনের সক্ষমতা-ভিত্তিক উন্নয়ন ধারণার আলোকে মানুষের জীবনযাত্রা, সুযোগ ও সক্ষমতাকে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
দিনব্যাপী আয়োজনে বিভিন্ন সেশনে বক্তারা গবেষণালব্ধ তথ্যকে কার্যকর কর্মসূচি ও জাতীয় নীতি প্রণয়নে ব্যবহারের ওপর জোর দেন। তাঁদের মতে, টেকসই উন্নয়নের জন্য শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন নয়, সেই প্রবৃদ্ধির সুফল মানুষের কাছে পৌঁছানো এবং বৈষম্য কমানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এমএইচ
আরও পড়ুন










