ঢাকা, সোমবার   ১০ আগস্ট ২০২০, || শ্রাবণ ২৬ ১৪২৭

Ekushey Television Ltd.

বাল্যবিয়ে ঠেকানো ইতি এখন বাংলাদেশের ইতিহাস

চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি

প্রকাশিত : ২০:৩২ ৯ ডিসেম্বর ২০১৯

ইতি খাতুন

ইতি খাতুন

এসএ গেমসে প্রথম নারী হিসেবে তিনটি সোনা জিতে নতুন ইতিহাস গড়লেন চুয়াডাঙ্গার ইতি খাতুন। সত্যিই এক সোনার মেয়ে। রোববার (৮ ডিসেম্বর) মেয়েদের রিকার্ভে মেয়েদের দলগত ও মিশ্র দলগত ইভেন্টে সোনা জিতেছেন। আজ একটা রেকর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে খেলতে নেমেছিলেন। শেষ পর্যন্ত পেরেছেন ইতি। গড়েছেন এক নতুন ইতিহাস। 

রিকার্ভ মেয়েদের এককের ফাইনালে ভুটানের কিনলে শেরিংকে ৭-৩ সেটে হারিয়ে জেতেন সোনা। ঘরোয়া টুর্নামেন্টে নিজেকে চিনিয়েছেন ইতি। এ বছর জাতীয় জুনিয়রে রিকার্ভেও ব্যক্তিগত ইভেন্টে জেতেন রুপা, জুনিয়র ক্যাডেট বিভাগে জেতেন সোনা।

বাংলাদেশের এসএ গেমসের ৩৫ বছরের ইতিহাসে এর আগে কোনও নারী খেলোয়াড় একই গেমসে তিনটি সোনা জিততে পারেনি। আজ পোখারার অন্যপূর্ণার কোলে দাঁড়িয়ে যে ইতিহাস লিখলেন ইতি।

যদিও রেকর্ডের কথা জানতেন না ইতি। এক সাংবাদিক বিষয়টা মনে করিয়ে দিতেই বলছিলেন, ‘আমি এটা জানার পর আরও বেশি করে চেষ্টা করেছি, যেন এই সোনার পদকটাও জিততে পারি। শেষ পর্যন্ত পেরেছি এ জন্য ভালো লাগছে।’

এতটাই দুশ্চিন্তায় ভালো ঘুম হয়নি গতরাতে, ‘গত রাতে ভালোভাবে ঘুমাতে পারিনি। এত দিন কিছু নিয়ে টেনশন করিনি। কিন্তু কাল ঘুমাতে পারিনি। মনে হচ্ছিল ঘুমের ঘোরেও কাঁপছি। এরপর সকালে একটু স্বাভাবিক হয়ে অনুশীলন করেছি।’

বিস্ময়ের ঘোর ছিল ইতির কণ্ঠে, ‘আমি ভাবতেও পারিনি এ পর্যন্ত আসতে পারব। আমার বাবা-মা শুরুতে চাইতো না আর্চারি খেলি। কিন্তু ভালো করার পর ওনারা সহায়তা দেন। এমনকি আমার স্কুলের ম্যাডাম পর্যন্ত কাল ফোন দিয়েছেন। আমি খুব খুশি।’

বাংলাদেশের আর্চারির ইতিহাসে এই বিস্ময় বালিকার আজ হয়তো এখানে আসাই হতো না। আর্চারিতে না এলে কোনও এক গ্রামে ঘরকন্যার কাজে হয়তো ব্যস্ত থাকতেন এত দিন।

কতই বা বয়স হবে তখন? ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়তেন ইতি খাতুন। পাড়ার সাথীদের সঙ্গে পুতুল খেলেই সময়টা কেটে যেত বেশ। আরও একটা খেলার প্রতি ভীষণ টান ছিল ইতির। তীর-ধনুকের খেলায় এতটাই মজে গিয়েছিল যে, বাবা-মায়ের বকুনিকেও পরোয়া করতেন না। অনুশীলন শেষে একদিন বাড়িতে এসে দেখেন, বাবা তাকে বিয়ে দেয়ার প্রস্তুতি নিয়েছেন। পাত্রপক্ষ বসা বাড়ির বারান্দায়। বিয়ের সব আয়োজন শেষ।

শাড়ি পরে ঘোমটা মাথায় পাত্রপক্ষের সামনে গিয়ে দাঁড়ায় ইতি। পাত্রপক্ষের পছন্দও হয়ে যায় ‘বালিকা বধূকে’ দেখে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে বেঁকে বসেন ইতি। বিয়েটা আর হয়নি। বিয়ের আসর থেকে উঠে আসা মেয়েটাই এবারের দক্ষিণ এশিয়ান গেমস মাতাচ্ছেন।

তির নবম জাতীয় আর্চারিতে ২০১৮ সালে জেতেন প্রথম পদক। তিরন্দাজ সংসদের হয়ে মেয়েদের রিকার্ভ ইভেন্টে ব্রোঞ্জ জেতেন চুয়াডাঙ্গার কিশোরী। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের (এনএসসি) প্রতিভা অন্বেষণের আবিষ্কার ইতি। চুয়াডাঙ্গা স্টেডিয়ামে ২০১৬ সালে ডিসেম্বরে আর্চারির প্রাথমিক বাছাইয়ে হয়েছিল প্রথম। চুয়াডাঙ্গার ঝিনুক মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী প্রথমবার আন্তর্জাতিক আসরে সুযোগ পেয়েই জ্বলে উঠলেন।

বাবা ইবাদত আলী হোটেলের কর্মচারী। তিন মেয়ে ইভা খাতুন, ইতি খাতুন ও স্মৃতি খাতুনকে নিয়ে সংসার চালাতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয়। মেয়েদের স্কুলের খরচ জোগাতে পারেন না বেশির ভাগ সময়। তাইতো মেয়েকে বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সিদ্ধান্তটা যে কত বড় ভুল ছিল, সেটা পরে স্বীকার করেন।

বাল্যবিবাহ ঠেকিয়ে অনেক আগেই একটা যুদ্ধে জিতে গেছেন ইতি। মাঠের লড়াইয়ে একের পর এক জিতে এবার নাম লেখালেন ইতিহাসে।

এনএস/


New Bangla Dubbing TV Series Mu
New Bangla Dubbing TV Series Mu

© ২০২০ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি