ঢাকা, রবিবার   ১৭ অক্টোবর ২০২১, || কার্তিক ১ ১৪২৮

টেস্ট ক্রিকেটে দু’দশক : কুঁড়ির বৃন্তবন্দী কুড়ি বৃত্তান্ত

নাজমুল হক তপন

প্রকাশিত : ১৩:৩১, ১০ নভেম্বর ২০২০ | আপডেট: ১৩:৩৮, ১০ নভেম্বর ২০২০

দেখতে দেখতে ক্রিকেটের সর্বোচ্চ মর্যাদার আসর টেস্ট ক্রিকেটে দু’দশক পূর্ণ হয়েছে বাংলাদেশের। ২০০০ সালের আজকের দিন অর্থাৎ ১০ নভেম্বর ক্রিকেটের অভিজাত মঞ্চে অভিষিক্ত হয় বাংলাদেশ। সেই থেকে এখন পর্যন্ত ১১৯ টেস্ট খেলেছে টাইগাররা। এর মধ্যে ৮৯ ম্যাচে হার। আর জয় মোটে ১৪ ম্যাচ। বাকি ১৬ ম্যাচ ড্র। একটি জয়ের বিপরীতে প্রায় সাত ম্যাচে হার।

দু’দশকে টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের জায়গাটা যে এখনো নড়বড়ে সেটা বুঝতে খুব বেশিদূর যাওয়ার দরকার নেই। গত বছর ঘরের মাটিতে টেস্ট ক্রিকেটের পুঁচকে আফগানিস্তানের বিপক্ষে ন্যুনতম প্রতিদ্বন্দ্বিতাটুকুও গড়ে তুলতে পারেনি বাংলাদেশ। ওই সময় মাত্র দুই টেস্ট খেলার অভিজ্ঞতাপুষ্ট আফগানদের কাছে ২২৪ রানের ব্যবধানে হেরেছে টিম টাইগার্স। 

বলা যায়, বাংলাদেশ টেস্ট মর্যাদায় আসীন হয়েছিল সাংগঠনিক দক্ষতার জোরে। তবে অভিষেক টেস্টে ময়দানী দক্ষতায় খুব একটা নিরাশ করেনি ‘টিম টাইগার্স’। ক্রিকেটের প্রতিষ্ঠিত শক্তি ভারতের বিপক্ষে প্রথম তিন দিন সমানতালে লড়াই করেছিল নাইমুর রহমান দুর্জয় ব্রিগেড। ম্যাচে টস জিতে আগে ব্যাট করতে নেমে ৪০০ রানের সৌধ গড়ে বাংলাদেশ। জবাবে ভারতের ইনিংস থামে ৪২৯ রানে। শেষ দুদিনে অবশ্য পথ হারায় টাইগাররা। 

টেস্ট ক্রিকেটের নতুন দল হিসেবে সম্ভবানার আগমনী বার্তা জানাতে সমর্থ হয় বাংলাদেশ। তবে দুদশকের পথ পরিক্রমায় সম্ভাবনার এই  কুঁড়িটা ফুল হয়ে ফোটেনি। আটকে আছে বৃন্তবন্দী হয়েই। 

বিশেষ করে টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশ ক্রিকেটের একটা বিষয় খুবই লক্ষ্যনীয়। কুড়ি বছরে ব্যক্তিগত সাফল্যে টেস্ট ক্রিকেটের বড় বড় রেকর্ডগুলোকে নিয়মিতভাবেই বড় ধরনের ঝাকি দিয়ে আসছে বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা। অসংখ্য রেকর্ডের মালা গলায় পড়েছে আমাদের ক্রিকেটাররা। তবে এই ব্যক্তিগত অর্জনগুলো বেশিরভাগ সময়ই সর্বোচ্চ দলীয় প্রাপ্তির ফসল হিসেবে ঘরে ওঠেনি। সব কথার এক কথা, ব্যক্তিগত অর্জনের দিক থেকে যতটা আলো ছড়িয়েছেন টাইগাররা, দলের অর্জন ততটা উজ্জ্বল তো নয়ই, বরং অনেকটায় ফিকে। 
   
টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের কুড়ি বছরের অর্জনের চালচিত্রটা দেখে নেয়া যাক।  

(১) স্বপ্নের অভিষেকে ইতিহাস গড়েন বুলবুল, বল হাতে রেকর্ড গড়েন দুর্জয় (ঢাকা, নভেম্বর ২০০০)             
কূটনৈতিক সাফল্যে পাওয়া টেস্ট স্ট্যটাসের মর্যাদা রক্ষা করতে পারবে কী-না এমন একটা সংশয় নিয়ে ক্রিকেটের অভিজাত মহলে পা রাখল বাংলাদেশ। ১০ নভেম্বর যত এগিয়ে আসতে থাকল মর্যাদা ধরে রাখার শঙ্কটা রুপ নিতে থাকল আতঙ্কে। অবশ্য খেলতে নেমেই সব শঙ্কা , আতঙ্ক ভুলিয়ে দিলেন আমিনুল ইসলাম বুলবুল। 

১৮৭৭ সালের টেস্ট ক্রিকেটের অভিষেকে সবচেয়ে আলোচিত নাম চার্লস ব্যানারম্যানকেই যেন ফিরিয়ে আনলেন বুলবুল। কোন দেশের অভিষেকে তৃতীয় ব্যাটসম্যান হিসেবে সেঞ্চুরি করার কীর্তি গড়লেন। ব্যানারম্যানের রেকর্ড থেকে ২০ রান পেছনে থেকে থামলেন বুলবুল। দেশের অভিষেকে ১৬৫ রান করেছিলেন ব্যানারম্যান। বুলবুল খেললেন ১৪৫ রানের চোখ ঝলসানো ইনিংস। এর মধ্যদিয়ে কোন দেশের অভিষেকে দ্বিতীয় সর্ব্বোচ্চ রান করার রেকর্ডটিও নিজের করে নিয়েছেন বুলবুল।

বুলবুলের ইতিহাস গড়ার পর বল হাতে রেকর্ড গড়লেন অধিনায়ক নাইমুর রহমান দুর্জয়ও। ১৩২ রান খরচায় ৬ উইকেট তুলে নিয়ে ভারতীয় ইনিংস গুটিয়ে দিলেন বাংলাদেশ অধিনায়ক। সেইসঙ্গে দেশের হয়ে এক ইনিংসে প্রথমবারের মতো ৫ বা ততোধিক উইকেট নেয়ার রেকর্ডও গড়লেন দুর্জয়।  

(২) জাভেদ ওমর গুল্লুর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ব্যাটিং (বুলাওয়ে, এপ্রিল ২০০১)
নিজের অভিষেক টেস্টকে আপন আলোয় রাঙালেন ওপেনার জাভেদ ওমর বেলিম গুল্লু। অভিষেকে টেস্ট ইতিহাসের দ্বিতীয় ব্যাটসম্যান হিসেবে ইনিংসের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত অপরাজিত থাকেন এই ওপেনার। ব্যক্তিগত ৮৫ রানে অপরাজিত থেকে সতীর্থদের আসা -যাওয়ার মিছিল দেখেন গুল্লু। তার আগে অভিষেকে এমন কৃতিত্ব দেখান ইংলিশ ওপেনার পেলহাম ওয়ার্নার। ১৯৮৮ সালে জোহান্সবার্গ টেস্টে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ইনিংসের গোড়াপত্তন করতে এসে ১৩২ রানে অপরাজিত ছিলেন ওয়ার্নার।

ওই বুলাওয়ে টেস্টে বাংলাদেশ ইনিংস ব্যবধানে হারলেও ম্যাচ সেরার পুরস্কার পান জাভেদ। টেস্টে দুই ইনিংসেই হাফ সেঞ্চুরির কৃতিত্ব দেখান। এটাই ছিল বাংলাদেশ দলের কোন ব্যাটসম্যানের প্রথমবারের মতো দুই ইনিংসেই হাফ সেঞ্চুরির রেকর্ড। 

(৩) টেস্ট ক্রিকেটের সর্বকনিষ্ঠ সেঞ্চুরিয়ান আশরাফুল (কলম্বো, ২০০১ সেপ্টেম্বর)
টেস্ট অভিষেকেই ক্রিকেট দুনিয়াকে তাক লাগিয়ে দেন মোহাম্মদ আশরাফুল। এশিয়ান টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব মাঠে দ্বিতীয় ইনিংসে ১১৪ রানের রাজসিক ইনিংস খেলেন এই লিটল মাস্টার। তখন তার বয়স মাত্র ১৭ বছর ৬১ দিন। এর মধ্যদিয়ে সবচেযে কম বয়সে টেস্ট সেঞ্চুরির রেকর্ডটি নিজের করে রেখেছেন আশরাফুল। ওই ম্যাচে বাংলাদেশ হারলেও লঙ্কান ঘুর্ণি জাদুকর মুত্তিয়া মুরালিধরনের সঙ্গে যুগ্মভাবে ম্যান অব দ্য ম্যাচ নির্বাচিত হন আশরাফুল। 

(৪) অলক কাপালির হ্যাটট্রিক (পেশোয়ার, আগস্ট ২০০৩)
২০০৩ সালের পাকিস্তান সফরে নিজেদেরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার জোরালো সম্ভাবনা তৈরি করে বাংলাদেশ। পেশোয়ারে দ্বিতীয় টেস্টে লেগ স্পিনার অলক কাপালির হ্যাটট্রিকের সুবাদে ৬৬ রানের লিড পায় বাংলাদেশ। পর পর তিন বলে তিনি ফিরিয়ে দেন সাব্বির আহমেদ, দানিশ কানেরিয়া ও ওমর গুলকে। সেইসঙ্গে টেস্ট ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ বোলার হিসেবে হ্যাটট্রিক করার কৃতিত্বের অধিকারী হন কাপালি। ওই সময় তার বয়স ছিল ১৯ বছর ২৪০ দিন। তার এই রেকর্ডটি স্থায়ী হয় ১৭ বছর। এ বছর ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশের বিপক্ষে টেস্টে সবচেয়ে কম বয়সী হিসেবে কাপালির রেকর্ড ভেঙ্গে নতুন রেকর্ড গড়েছেন পাকিস্তানী পেসার নাসিম শাহ।

(৫) রফিক ও পাইলটের সেঞ্চুরিতে ড্র (সেন্ট লুসিয়া, মে ২০০৪)
অর্জনের দিক থেকে এটা হয়তো খুব বড় কিছু নয়। তবে ক্রিকেটীয় মানদন্ডে ২০০৪ সালের ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফর বাংলাদেশের জন্য ভিন্ন কিছু। এর আগ পর্যন্ত টেস্ট খেলে ড্র করার কোন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেনি বাংলাদেশ। বলাই যায়, সেন্ট লুসিয়া টেস্টে প্রথমবারের মতো খেলে ড্র করতে সমর্থ হয় টাইগাররা। ওই টেস্টে সেঞ্চুরি করেন অধিনায়ক হাবিবুল বাশার সুমন।

তবে ম্যাচ বাঁচানোর জন্য প্রয়োজন ছিল আরও বেশি কিছুর। আর সেটাই করে দেখান মোহাম্মদ রফিক ও খালেদ মাসুদ পাইলট। প্রথম ইনিংসে নয় নম্বরে ব্যাট করতে নেমে ১১১ রানের ইনিংস খেলেন রফিক। আর দ্বিতীয় ইনিংসে ১০৩ রানে অপরাজিত থেকে দলের ড্রয়ে অনন্য ভূমিকা রাখেন খালেদ মাসুদ পাইলট।

(৬) এনামুল হক জুনিয়রের ঘুর্ণি জাদুতে প্রথম টেস্ট জয় (চট্টগ্রাম, জানুয়ারি ২০০৫)
টেস্ট খেলার পঞ্চম বছরের শুরুতে ৩৫তম টেস্টে এসে প্রথম জয়ের দেখা পায় বাংলাদেশ। দুই টেস্টের ওই সিরিজে চট্টগ্রামে প্রথম টেস্টে সফরকারী জিম্বাবুয়েকে ২২৬ রানে হারায় হাবিবুল বাশার সুমনের দল। ম্যাচে অভিষেকেই দ্বিতীয় ইনিংসে জিম্বাবুয়ে ইনিংসে ধস নামান বাহাতী স্পিনার এনামুল হক জুনিয়র। মাত্র ৪৫ রান খরচায় ৬ উইকেট শিকার করেন এই টিনেজার। ওই সময় এনামুল ১৮ বছরের তরুণ। বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়ের ম্যাচে সেরার পুরস্কারও পান তিনি। 

(৭) নাফিসের ব্যাটে প্রথম সিরিজ জয় (ঢাকা, জানুয়ারি ২০০৫)         
জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ওই সিরিজেই প্রথম টেস্ট জয়ের আনন্দ মিলিয়ে যেতে বসেছিল ঢাকায় দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে। সিরিজ জেতার জন্য বাংলাদেশের প্রযোজন ড্র। আর সিরিজ হার এড়াতে চাইলে জয়ই একমাত্র বিকল্প জিম্বাবুয়ের। সিরিজে ফিরতে মরিয়া সফরকারীরা প্রথম ইনিংসে লিড নিল ৮৭ রানের। দ্বিতীয় ইনিংসে তাদের সংগ্রহ দাঁড়াল ২৮৬ রান। চতুর্থ ইনিংসে বাংলাদেশের সামনে ৩৭৭ রান টপকানোর চ্যালেঞ্জ। আর ড্র করতে হলে প্রায় পৌনে দুদিন উইকেট আগলে রাখার কঠিন পরীক্ষা। 

ওপেনার নাফিস ইকবালের দৃঢ়তায় কঠিন পরীক্ষায় উতরে গেল বাংলাদেশ। প্রায় আট ঘণ্টা উইকেট আগলে রেখে বাংলাদেশের ড্রয়ের কাজটিকে সহজ করে দিলেন নাফিস। তার বিদায়ের পর বাকি পথটুকু নির্বিঘ্নেই পার করালেন রাজিন সালেহ ও খালেদ মাসুদরা। দ্বিতীয় ইনিংসে ১৪২ ওভারে ৫ উইকেট হারিয়ে ২৮৫ রান জমা পড়ল বাংলাদেশ ইনিংসে। এই ড্রয়ের সুবাদে  প্রথমবারের মতো সিরিজ জয়ের স্বাদ পায় টাইগাররা। 
                 
(৮) মুলতান ও ফতুল্লা ট্রাজেডি (মুলতান, আগস্ট ২০০৩ ও ফতুল্লা, এপ্রিল ২০০৬) 
এই দুবারই টেস্ট জয়ের খুব কাছাকাছি পৌঁছে যায় টাইগাররা। জয়ের সুবাস ছাড়িয়েও তীরে এসে তরী ডোবে বাংলাদেশের। মুলতানে ১ উইকেটে আর ফতুল্লায় হার ৩ উইকেটের ব্যবধানে।  দুক্ষেত্রেই চতুর্থ ইনিংসে প্রতিপক্ষ অধিনায়কের দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ের কাছে হারতে হয়েছে টাইগারদের। 

২০০৩ সালে মুলতানে সিরিজের তৃতীয় ও শেষ টেস্টে প্রথম ইনিংসে ১০৬ রানের লিড নেয় বাংলাদেশ। জয়ের জন্য ২৬১ রানের টার্গেটের সামনে একটা পর্যায়ে ২০৫ রানে ৮ উইকেট হারায় পাকিস্তান। কিন্তু প্রান্ত আগলে রেখে উমর গুল ও ইয়াসির আলীকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশের বাড়া ভাতে ছাই ঢেলে দেন পাকিস্তান অধিনায়ক ইনজামাম-উল হক। অপরাজিত থাকেন ১৩৮ রানে। 

তিন বছর পর মুলতানের দুঃস্বপ্নই যেন ফিরে আসল ফতুল্লায়। শাহরিয়ার নাফীস (১৩৮) , হাবিবুল বাশার সুমন (৭৬) ও রাজিন সালেহর (৬২) নৈপুন্যে প্রথম ইনিংসে নিজেদের স্কোরবোর্ডে ৪২৭ রান জমা করে বাংলাদেশ। জবাবে ২৬৯ রানে শেষ হয় অস্ট্রেলিযা ইনিংস। ১৫৮ রানের লিড পায় বাংলাদেশ। 

দ্বিতীয় ইনিংসে স্বাগতিকরা আাটকে যায় ১৪৮ রানে। জয়ের জন্য ৩০৬ রানের লক্ষ নিয়ে খেলতে নেমে ২৩১ রানের মাথায় ষষ্ঠ উইকেট হারায় অস্ট্রেলিয়া। জয়ের জন্য শেষ চার উইকেটে দরকার ৭৫ রান। এখান থেকে বাংলাদেশের আশার বেলুন ফুটো করে দিলেন অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক রিকি পন্টিং। ১১৮ রানে অপরাজিত থেকে জয় নিয়েই মাঠ ছাড়লেন অজি অধিনায়ক।

(৯) প্রথম বিদেশ জয় (সেন্ট ভিনসেন্ট ও গ্রেনাডা, আগস্ট ২০০৯)                 
বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের প্রথম সিরিজ জেতাটা পরিসংখ্যানের দিক থেকেই যা একটু গুরুত্ব বহন করে। কেননা ২০০৯ সালের ওই সফরে প্রতিপক্ষ হিসেবে ওয়েস্ট ইন্ডিজের যে দলটি খেলেছিল সেই দলটিকে দ্বিতীয় সারির বললেও বেশি বলা হবে। সম্পূর্ণ আনকোরা ওই দলটিকে ২-০ ব্যবধানে সহজেই হারায় বাংলাদেশ। সেন্ট ভিনসেন্ট প্রথম টেস্টে বাংলাদেশ জেতে ৯৫ রানের ব্যবধানে। আর গ্রেনাডায় জয় আসে ৫ উইকেটের ব্যবধানে। ওই সিরিজে প্রথম টেস্টে মাশরাফি মর্তুজা ইনজুরি আক্রান্ত হওয়ার পর বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেন সাকিব আল হাসান। 

(১০) সাকিব নাম্বার ওয়ান                              
ক্রিকেটে অলরাউন্ডার হিসেবে এক নাম্বার জায়গাটি সাকিব আল হাসানের জন্য যেন নির্ধারিত। ওয়ানডে ক্রিকেটে ২০০৯ সালে বিশ্ব সেরা অলরাউন্ডারের তকমাটা নিজের করে নেন। এর দু’বছর পর টেস্ট র‌্যাংকিংয়েও সেরা অলরাউন্ডার হিবেবে সবাইকে পেছনে ফেলেন সাকিব। ক্রিকেটের তিন ফরম্যাটেই নাম্বার ওয়ান অলরাউন্ডার হওয়ার কৃতিত্ব দেখিয়েছেন এই বাহাতী। 

এক বছরের  নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে ওযানডের সেরা অলরাউন্ডার হিসেবেই ফিরেছেন সাকিব। মাঠের খেলা শুরু হলে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব ফিরিয়ে আনার জন্য সাকিব যে প্রাণপাত করবেন তা বলাই বাহুল্য। 

শুধু নিজের সময়ই না সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডারদের সংক্ষিপ্ত কাতারে সাকিবের নামটিও আলোচিত। ৫৬ টেস্টে ব্যাট হাতে ৩৯ দশমিক ৪০ গড়ে তার ব্যাট থেকে এসেছে ৩ হাজার ৮৬২ রান।  বল হাতে ৩১ দশমিক ১২ গড়ে শিকার করেছেন ২১০ উইকেট। টেস্টে তিন হাজার রানের পাশাপাশি দুশো উইকেট শিকারীর ক্লাবে পৌঁছে গেছেন তিনি। 

ক্যারিয়ারে যদি একশ’ টেস্ট খেলতে পারেন এবং সাফল্যের এই ধারা বজায় রাখতে পারেন সাকিব কোথায় গিয়ে পৌঁছাবেন তার উত্তর দেবে সময়। তবে মাকিব মাঠে নামা মানেই ঘটনার ঘনঘটা। একই টেস্টে সেঞ্চুরির পাশাপাশি ১০ উইকেট নেয়ার মতো ক্রিকেটার বাংলাদেশ দলেও আছে! টেস্টে এমন কৃতিত্ব সাকিব দেখিয়েছেন দু’দুবার।

(১১) লর্ডসের অনার্স বোর্ডে তামিম (লর্ডস, মে ২০১০)            
ক্রিকেট আর লর্ডস যেন বিনে সুঁতোয় গাঁথা। ক্রিকেটের এই প্রেস্টিজিয়াস মঞ্চে নিজের সেরাটা পাওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকেন  ক্রিকেটাররা। বোলাররা যেমন চান ৫ উইকেট তেমনি ব্যাটসম্যানদের আরাধ্য সেঞ্চুরি। আর এমনটা করতে পারলেই যে লর্ডসের অনার্স বোর্ডে নাম ওঠে। 

২০১০ সালের ৩০ মে লর্ডসের অনার্স পরীক্ষায় উতরে গেলেন তামিম ইকবাল। বলা বাহল্য প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে এমন কৃতিত্ব দেখান তামিম। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ওই লর্ডস টেস্টে  বাংলাদেশ অবশ্য হেরে যায় ৮ উইকেটের ব্যবধানে। দ্বিতীয় ইনিংসে ৯৪ বলে সেঞ্চুরি পূর্ণ করার পর ১০৩ রানে সাজ ঘরে ফেরেন তিনি। 
 
(১২) অভিষেকেই রুপকথা লিখলেন আবুল হাসান রাজু (খুলনা, নভেম্বর ২০১২)
২০১২ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে খুলনা টেস্টে অভিষেকই ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নেন আবুল হাসান রাজু। টেস্টে দশ নম্বরে ব্যাট করতে নেমে ১১৩ রানের ইনিংস খেলেন এই অলরাউন্ডার। টেস্ট ইতহাসে দ্বিতীয় ক্রিকেটার হিসেবে এমন কীর্তি গড়েন আবুল হাসান। তার আগে দশ নম্বরে নেমে সেঞ্চুরির একক মালিকানা ছিল অস্ট্রেলিয়ার রেগি ডাফের। ১৯০২ সালে মেলবোর্নে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দশ নম্বরে ব্যাট করতে নেমে ১০৪ রানের ইনিংস খেলেছিলেন ডাফ। এর ১১০ বছর পর সেই রেকর্ডে ভাগ বসালেন আবুল হাসান।

(১৩) ইতিহাসের পাতায় সোহাগ গাজী (চট্টগ্রাম, অক্টোবর ২০১৩) 
টেস্ট ক্রিকেট ইতিহাসে বিরল এক কীর্তির মালিকানা বাংলাদেশের অলরাউন্ডার সোহাগ গাজীর। চট্টগ্রাম টেস্টে নিউজিল্যান্ডর বিপক্ষে ব্যাট হাতে সেঞ্চুরির সঙ্গে বল হাতে হ্যাটট্রিক করেন সোহাগ। প্রথম ইনিংসে অপরাজিত থাকেন ১০১ রানে। এরপর দ্বিতীয় ইনিংসে হ্যাটট্রিকসহ মাত্র ২৭ রান খরচায় তুলে নেন ৬ উইকেট। ১৪৩ বছরের টেস্ট ইতিহাসে এমন কৃতিত্ব আর একটিও নেই।

(১৪)  ছয়শ’ রানের চূড়ায় বাংলাদেশ  (গল, মার্চ ২০১৩)                                            
টেস্ট ক্রিকেটে একবারই ৬শ’ রানের চূড়ার নাগাল পেয়েছে বাংলাদেশ। ২০১৩ সালে স্বাগতিক শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে গল ইন্টারন্যাশনাল স্টেডিয়ামে প্রথম টেস্টের প্রথম ইনিংসে ৬৩৮ রান সংগ্রহ করে বাংলাদেশ। এই ইনিংসে বাংলাদেশর প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে জোড়া শতক হাকান মুশফিকুর রহিম। এছাড়াও সেঞ্চুরি পান মোহাম্মদ আশরাফুল (১৯০) ও নাসির হোসেন (১০০)। 

(১৫) মুমিনুলের উভয় ইনিংসে সেঞ্চুরী (চট্টগ্রাম, ফেব্রুয়ারি ২০১৮)                                       
২০১৮ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে প্রথম ইনিংসে ১৭৬ রানের ইনিংস খেলেন মুমিনুল হক। দ্বিতীয় ইনিংসে তার ব্যাট থেকে আসে ১০৫ রান। এর মধ্যদিয়ে বাংলাদেশের প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে একই টেস্টের উভয ইনিংসেই সেঞ্চুরি করার কৃতিত্ব দেখান মুমিনুল। 
                          
(১৬) মিরাজ ঘূর্ণিতে ইংল্যান্ডের সঙ্গে সিরিজে সমতা ( মিরপুর, নভেম্বর ২০১৬)          
২০১৬ সালে ঘরের মাটিতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দুই টেস্টের সিরিজে প্রথম টেস্টে হাড্ডহাড্ডি লড়াই করে মাত্র ২২ রানে হেরে যায় বাংলাদেশ। এর আগ পর্যন্ত ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কখনোই টেস্ট জয়ের স্বাদ পায়নি টাইগাররা। এই টেস্টে অভিষেকেই ৬ উইকেট নিয়ে আলো ছড়ান মেহেদী হাসান মিরাজ। তবে দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে মিরাজ হয়ে উঠলেন আরও বিপজ্জনক। দু ইনিংস মিলিয়ে ১২ উইকেট শিকার করলেন এই ডানহাতী অফস্পিনার। বাংলাদেশ ম্যাচ জিতল ১০৯ রানে। আর এই সুবাদে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথমবারের মত সমতায় থেকে সিরিজ শেষ করল টাইগাররা।

(১৭) অস্ট্রেলিয়াকে মাটিতে নামাল বাংলাদেশ (মিরপুর , আগস্ট - সেপ্টেম্বর ২০১৭)
ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়াকে হারানো বিশেষ ঘটনা। সাকিব আল হাসানের অলরাউন্ড নৈপুন্যে অবশেষে অস্ট্রেলিয়াকে মাটিতে নামাতে সমর্থ হল বাংলাদেশ। মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামে প্রথম ইনিংসে ৮৪ রান করলেন সাকিব। আর বল হাতে দুই নিংসেই শিকার করলেন ৫ উইকেট।  স্নায়ুক্ষয়ী ম্যাচে বাংলাদেশ জিতল ২০ রানে। ম্যাচ সেরার পুরস্কার পেলেন সাকিব। 
তবে প্রথম টেস্টের এই সুখস্মৃতি দ্বিতীয় ও শেষ টেস্ট অবধি টেনে নিতে পারেনি টাইগাররা। দ্বিতীয় টেস্টে ৭ উইকেটে জিতে সিরিজে সমতায় ফেরে সফরকারী অস্ট্রেলিয়া। 

(১৮) মুশফিকের তৃতীয় ডাবল সেঞ্চুরী (মিরপুর, ফেব্রুয়ারি, ২০২০)              
বাংলাদেশের প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি করার কৃতিত্ব দেখান মিষ্টার ডিপেন্ডাবল খ্যাত মুশফিকুর রহিম। তবে এখানেই থেমে থাকেননি। নিজের ডাবল সেঞ্চুরির সংখ্যাকে তিনে উন্নীত করেছেন এই উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান। আর এটা করার পথে বিরল কীর্তিও গড়েছেন মুশফিক। টেস্ট ইতিহাসে উইকেটরক্ষক -ব্যাটসম্যান হিসেবে একাধিক ডবল সেঞ্চুরি করার কৃতিত্ব আর কারো নেই। 

বলা বাহুল্য, বাংলাদেশের পাঁচটি ডাবল সেঞ্চুরির তিনটিই মুশফিকের দখলে। বাকি দুই ডাবল সেঞ্চুরিয়ান সাকিব আল হাসান ও তামিম ইকবাল।  

(১৯) অভিষেকে ৫ উইকেটের ছড়াছড়ি            
দুর্দান্ত অভিষেকের পর ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে আসাটা বাংলাদেশর ক্রিকেটারদের নৈমিত্তিক বৈশিষ্ট্য। শুধু অভিষেক টেস্টেই এক ইনিংসে ৫ উইকেট শিকারের কৃতিত্ব দেখিয়েছেন বাংলাদেশের ৮ জন বোলার। দেশের অভিষেকে ৬ উইকেট নিয়ে এই যাত্রা শুরু করেছিলেন নাইমুর রহমান দুর্জয়। সর্বশেষ ২০১৮ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে এই কৃতিত্ব দেখিয়েছেন নাইম হাসান। শ্রীলঙ্কার সঙ্গে তুলনাটা করলেই বিষয়টা পরিষ্কার হযে যাবে। এখন পর্যন্ত শ্রীলঙ্কার ৪ জন ক্রিকেটার অভিষেক টেস্টের এক ইনংসে পেয়েছেন ৫ উইকেট। জিম্বাবুয়ে ক্রিকেটে এই সংখ্যাটা মোটে দুই। 

(২০) শততম টেস্টে  জয় (কলম্বো, মার্চ ২০১৭)                                                      
২০১৭ সালের শ্রীলঙ্কা সফর কাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য বিশেষ একটা ব্যাপার। এই সফরে নিজেদের শততম টেস্টে স্বাগতিক শ্রীলঙ্কাকে হারানোর গৌরব অর্জন করে টাইগাররা। ম্যাচে সাকিব আল হাসানের সেঞ্চুরিতে ভর দিয়ে প্রথম ইনিংসে ১২৯ রানের লিড পায় বাংলাদেশ।  জয়ের জন্য চতুর্থ ইনিংসে ১৯১ রান তোলার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে বাংলাদেশ। 

৪ উইকেট হাতে রেখেই  জয়ের বন্দরে পৌঁছে যায় মুশফিকরা। প্রথম ইনিংসে ৪৯ রান করার পর দ্বিতীয় ইনিংসে ৮২ রান করেন তামিম ইকবাল। পান ম্যাচ সেরার স্বীকৃতিও। 

এআই//


Ekushey Television Ltd.

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি