ঢাকা, মঙ্গলবার   ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রতিদিনের মতো পাতা তুলতে যান মীরা, ফিরলেন নিথর দেহ হয়ে

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি

প্রকাশিত : ১৫:৪৪, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

Ekushey Television Ltd.

প্রতিদিনের মতো চা-বাগানের সেকশনে পাতা তুলতে গিয়েছিলেন মীরা হাজরা। হাতে ছিল চা পাতা তোলার পাতি গামছা। সংসারের অভাব মেটাতে নিরলস পরিশ্রম করছিলেন তিনি। ২৪ কেজি হাজিরার বাইরে যত বেশি পাতা তুলবেন, ততই বাড়বে আয়। তাই প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০ কেজি পর্যন্ত চা পাতা তুলতেন মীরা। কিন্তু তার আর ঘরে ফেরা হলো না। 

সোমবার চা পাতা তুলে ফিরতে গিয়ে একটি ড্রেন পার হওয়ার সময় পা পিছলে পড়ে যান তিনি। সেখানেই নিভে যায় ৪০ বছর বয়সী এই হাস্যোজ্জ্বল নারীর জীবন।

মীরা হাজরা শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভাড়াউড়া চা-বাগানের রামপাড়া কলোনির বাসিন্দা। স্বামী দীপু হাজরা, এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে ছিল তাঁর সংসার। পরিবারের আয়ের একমাত্র অবলম্বন ছিলেন মীরাই।

বাগান সূত্র ও স্বজনদের ভাষ্য, ঘটনার দিন সকালে মীরা প্রথম ধাপের চা পাতা তুলে ওজন দেন। দুপুরে খাবার পর আবার চলে যান দ্বিতীয় ধাপের পাতা তুলতে। পাতা তোলার পর অন্য শ্রমিকদের সঙ্গে ফেরার কথা থাকলেও কোনো একসময় তিনি সবার পেছনে পড়ে যান।

ভাড়াউড়া চা-বাগানের ২৯ নম্বর সেকশনে পানি নিষ্কাশনের একটি ড্রেন পার হওয়ার সময় বৃষ্টিতে পিচ্ছিল হয়ে থাকা জায়গায় তাঁর পা পিছলে যায়। ড্রেনের নিচে পড়ে গিয়ে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এদিকে অন্য শ্রমিকরা পাতা জমা দিয়ে বাগানে ফিরে এলেও মীরা আর ফেরেননি। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নামে। মীরা বাড়িতে না ফেরায় স্বজনরা প্রথমে আশপাশের কলোনি ও বিভিন্ন স্থানে খোঁজ শুরু করেন। কোথাও তাঁর সন্ধান না পেয়ে রাত প্রায় ১২টার দিকে তাঁরা সেকশনের দিকে যান।

সেখানে গিয়ে ২৯ নম্বর সেকশনের একটি ড্রেনের ভেতর মীরার নিথর দেহ দেখতে পান স্বজনরা। ড্রেনের পাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে ছিল তাঁর তোলা চা পাতার বোঝা।

যে হাতে প্রতিদিন চা পাতা তুলে সংসারের চাকা সচল রাখতেন, সেই হাতেই সেদিন ছিল শেষবারের মতো তোলা পাতার বোঝা। আর সেই পাতাই যেন হয়ে রইল তাঁর অসমাপ্ত জীবনের শেষ স্মৃতি।

ভাড়াউড়া চা-বাগানের জিএম গোলাম মোহাম্মদ শিবলী বলেন, “মীরা আমাদের বাগানের একজন দায়িত্বশীল শ্রমিক ছিলেন। তিনি সবসময় হাসিখুশি থাকতেন। কাজে কখনো অবহেলা করেননি। তাঁর মৃত্যুতে আমরা মর্মাহত। বাগানের পক্ষ থেকে তাঁর পরিবারকে প্রয়োজনীয় সহায়তা করা হবে।”

শ্রমিক নেতা দুলাল হাজরা বলেন, “মীরা সংসারের হাল ধরতে প্রচুর পরিশ্রম করতেন। প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০ কেজি পাতা তুলতেন। ঘটনার দিন বৃষ্টিতে রাস্তা পিচ্ছিল ছিল। সম্ভবত পাতা নিয়ে ফেরার সময় পা পিছলে তিনি ড্রেনে পড়ে যান। এটি একটি দুর্ঘটনা।”

মীরার আকস্মিক মৃত্যুতে ভাড়াউড়া চা-বাগানজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। যে নারী প্রতিদিন অন্যদের সঙ্গে হাসিমুখে সেকশনে যেতেন, সেই সেকশন থেকেই শেষ পর্যন্ত ফিরলেন নিথর হয়ে।

সকালে সহকর্মী ও স্বজনরা তাঁকে শেষ বিদায় জানান। এরপর শুরু হয় তাঁর শেষকৃত্য।

এএইচ


Ekushey Television Ltd.

© ২০২৬ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি