ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২০ আগস্ট ২০২৬

ইসরায়েলিদের দেশ ছাড়ার ‘সুনামি’, বদলে যেতে পারে দেশটির ভবিষ্যৎ

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ১৩:২২, ২০ আগস্ট ২০২৬ | আপডেট: ১৩:৪৬, ২০ আগস্ট ২০২৬

Ekushey Television Ltd.

চলতি বছরের শেষের দিকে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের আগে বিপুল সংখ্যক ইসরায়েলি দেশ ছাড়ছেন। এর মধ্য দিয়ে কয়েক দশক ধরে চলে আসা একটি প্রবণতা উল্টো পথে মোড় নিচ্ছে।

ইসরায়েলি কর কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত একটি গবেষণায় এমন সব প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু উঠে এসেছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে—ইসরায়েলি সরকার ক্রমশ কঠোরপন্থী ও ডানঘেঁষা হয়ে ওঠায় উচ্চশিক্ষিত ও বিত্তবান ইসরায়েলিরা দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। অনেকেই বলছেন, নিজের দেশটিকে এখন আর তারা চিনতে পারছেন না।

গবেষণায় দেখা গেছে যে, আগের বছরগুলোর তুলনায় ২০২৩ ও ২০২৪ সালে দেশত্যাগের হার কেবল বেশিই ছিল না, বরং যারা দেশ ছেড়েছেন তারা উচ্চ কর-সীমার (higher tax brackets) আওতাভুক্ত ছিলেন।

নিজেকে উদারপন্থী হিসেবে পরিচয় দেওয়া অনেক ইসরায়েলি মনে করেন যে, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকার দেশটিকে কম ধর্মনিরপেক্ষ করে তুলেছে এবং এর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের—বিশেষ করে বিচার বিভাগের—স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ করেছে।

২০২৩ সালে বিচার বিভাগীয় তদারকি বা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দুর্বল করার সরকারি উদ্যোগের বিরুদ্ধে হাজার হাজার ইসরায়েলি রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানান; তারা একে দেশের মৌলিক চরিত্র পরিবর্তনের একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখেছিলেন।

ইসরায়েলের শিক্ষিত ও অভিজাত শ্রেণির মধ্যে সরকারের প্রকৃতি নিয়ে যে সংশয় ও উদ্বেগ ছিল, তা আরও তীব্র হয় ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার ঘটনা এবং তার প্রতিক্রিয়ার ফলে। ওই প্রতিক্রিয়ার অংশ হিসেবে ইসরায়েল গাজায় এক ধরণের গণহত্যা চালায়—যাতে ৭৩ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হন—এবং পুরো অঞ্চলজুড়ে একাধিক ফ্রন্টে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। যদিও অনেক ইসরায়েলি হয়তো নীতিগতভাবে সেই যুদ্ধের বিরোধী নন, তবুও যুদ্ধের কোনো সুনির্দিষ্ট সমাপ্তি না থাকা এবং সরকারের ঘোষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থতা অনেককে এক অন্তহীন সংঘাতের চক্রে আটকা পড়ার অনুভূতি দিয়েছে।
তেল আভিভ বিশ্ববিদ্যালয়ের আগস্ট মাসের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, ইসরায়েল থেকে দেশত্যাগের হার বাড়ছে এবং যারা চলে যাচ্ছেন তাদের অধিকাংশই উচ্চশিক্ষিত ও সচ্ছল।

সেন্ট্রাল ব্যুরো অফ স্ট্যাটিস্টিকস-এর তথ্যের উপর ভিত্তি করে তেল আভিভ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমীক্ষায় দেখা গেছে, গত তিন বছরে প্রায় ২ লক্ষ ৭০ হাজার ইসরায়েলি দেশ ছেড়েছেন। ২০২৩ সালে ৮৬,৫০০-এর বেশি, ২০২৪ সালে প্রায় ৯১,৫০০ জন এবং ২০২৫ সালেও প্রায় একই সংখ্যক ইসরায়েলি দেশ ছেড়েছেন।

ইসরায়েল একটি ‘সুনামির’ সম্মুখীন হচ্ছে বলে সতর্ক করেছেন বিরোধী দলের নেতা গিলাদ কারিভ, যিনি ইসরায়েলি সংসদের অভিবাসন, আত্মীকরণ এবং প্রবাসী বিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার কিছুই করছে না।

কলঙ্ক
বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষকেরা প্রায়শই ইসরায়েল ত্যাগকারীদের সাথে যুক্ত কলঙ্কবোধের কথা বর্ণনা করেছেন, কারণ অনেক ইসরায়েলি, বিশেষ করে ডানপন্থীরা, সহজাতভাবেই ধরে নেন যে ইসরায়েলে অভিবাসন বিশ্বজুড়ে ইহুদিদের একটি স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষা।
১৯৭০-এর দশকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইৎঝাক রাবিন দেশত্যাগী ইসরায়েলিদের ‘কাপুরুষের দল’ (cascade of wimps) বলে অভিহিত করেছিলেন—একটি শব্দবন্ধ যা ইসরায়েলি রাজনীতির সব মহলেই পরবর্তীতে ব্যবহৃত হয়েছে। এমনকি অভিবাসন-সংক্রান্ত পরিভাষাতেও একটি স্পষ্ট মূল্যবোধগত দৃষ্টিভঙ্গি জড়িয়ে আছে: ‘আলিয়া’ (Aliyah)—ইসরায়েলে ইহুদিদের অভিবাসনের হিব্রু শব্দ—এর অর্থ হলো ‘উত্থান’ বা ‘উপরে ওঠা’; অন্যদিকে দেশত্যাগকারীদের প্রথাগতভাবে বলা হয় ‘ইওর্দিম’ (yordim)—যার অর্থ ‘যারা নিচে নেমে যায়’।

ইসরায়েলি জনমিতি বিশেষজ্ঞ ও পরিসংখ্যানবিদ সার্জিও ডেলা পারগোলা জানান, অতীতেও ইসরায়েলের অভিবাসন ভারসাম্যে ঘাটতি (ঋণাত্মক প্রবণতা) দেখা দিয়েছে, তবে তা ছিল ক্ষণস্থায়ী এবং প্রায়শই স্বল্পমেয়াদী অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিক্রিয়া। আয়ারল্যান্ড বা নিউজিল্যান্ডের মতো দেশগুলোতেও অনেক সময় আগত অভিবাসীর চেয়ে বহির্গামী অভিবাসীর সংখ্যা বেশি হয়েছে; কিন্তু ইসরায়েলের ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় ধরে এমন উচ্চ হারে দেশত্যাগের ঘটনাটি উদ্বেগজনক বলে তিনি মন্তব্য করেন।

আল জাজিরাকে ডেলা পারগোলা বলেন, “এবারের পরিস্থিতিতে অর্থনীতির ভূমিকা ঠিক কী, তা স্পষ্ট নয়। কেউ কেউ হয়তো ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারের সুযোগ খুঁজতে দেশ ছাড়ছেন; তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমরা দেখছি মানুষ দেশ ছাড়ছে নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা এবং দেশের রাজনৈতিক গতিপথ নিয়ে উদ্বেগের কারণে।”

ডেলা পারগোলা উল্লেখ করেন যে, ‘চরমপন্থী’ হিসেবে বিবেচিত ব্যক্তিদের প্রভাব ইসরায়েলের রাজনৈতিক মেরুকরণকে আরও গভীর করেছে। তিনি উদাহরণ হিসেবে জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের কথা উল্লেখ করেন, যিনি সম্প্রতি গাজায় প্রতি রাতে ৩০-৪০ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তবে তিনি যুক্তি দেন যে, এ ধরনের ব্যক্তিরা আসলে স্বাধীন কোনো শক্তি নন, বরং নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক কৌশলেরই হাতিয়ার।

তিনি বলেন, “কোনো ভুল করবেন না, এরা সবাই নেতানিয়াহুর পরিচালনায় বাজানো অর্কেস্ট্রারই একেকজন বাদক।”

সিটি সেন্ট জর্জ’স, ইউনিভার্সিটি অফ লন্ডনের অধ্যাপক মাইকেল বেন-গ্যাড বলেছেন, ইসরায়েলের মতো উদীয়মান অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার জন্য তরুণ, শিক্ষিত ও উদারমনা মানুষদের দেশে ধরে রাখা অত্যন্ত জরুরি। বেন-গ্যাড এ প্রসঙ্গে ড্যান বেন-ডেভিডের মতো অন্যান্য অর্থনীতিবিদের কয়েক দশক আগের উদ্বেগের কথা উল্লেখ করেন; তাঁরা সতর্ক করেছিলেন যে, ইসরায়েলের অর্থনৈতিক—এবং সেই সূত্রে রাজনৈতিক—ভবিষ্যৎ উদ্ভাবন ও উন্নয়নের সক্ষমতার ওপরই নির্ভরশীল।

অথচ, উদ্ভাবন ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতার চাহিদা যখন অভূতপূর্ব পর্যায়ে পৌঁছেছে, তখন দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে সেই দক্ষতাসম্পন্ন ইসরায়েলিদের হারই সবচেয়ে বেশি। উত্তর ইসরায়েলের ওরানিম কলেজের অভিবাসন ও জনমিতি বিষয়ক অধ্যাপক লিলাচ লেভ আরির একটি গুণগত গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে।

ইসরায়েলিদের দেশত্যাগের বিষয়ে নিজের আগের একটি পরিসংখ্যান-ভিত্তিক গবেষণায় যাদের নিয়ে কাজ করেছিলেন, তাদের তুলনায় সাম্প্রতিক দেশত্যাগী ঢেউয়ের—বিশেষ করে যারা যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমাচ্ছেন—তাদের বৈশিষ্ট্য বা প্রোফাইলটি এখন অনেক বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠছে বলে মন্তব্য করেছেন লেভ আরি। তিনি বলেন, “ক্রমশ উচ্চশিক্ষিত ও সফল তরুণ পরিবারগুলো দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে; অনেকের মতে, এর পেছনে বিচার বিভাগীয় সংস্কার, আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং যুদ্ধের প্রভাব রয়েছে।”

আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই—এ কথা জোর দিয়ে লেভ আরি বলেন, “আমরা কিছু দক্ষ মানুষকে হারাচ্ছি ঠিকই, তবে এখানে এখনও অনেক ভালো মানুষ রয়েছেন। তবে দেশত্যাগের এই ক্রমবর্ধমান ধারাটি প্রায় তিন বছর ধরে চলছে এবং এটি এমন একটি বিষয় যা নিয়ে আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত।”

রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ শির হেভারও স্বীকার করেন যে ইসরায়েল থেকে এই ব্যাপক দেশত্যাগের বিষয়টি একটি “বিশাল ঘটনা”, তবে তিনি মনে করেন ইসরায়েলের অনেকেই বিষয়টিকে ভুল দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন।

তিনি যুক্তি দেন যে, বিতর্কের বড় অংশটিই ডাক্তারদের মতো উচ্চ-আয়ের ও বিশিষ্ট পেশাজীবীদের চলে যাওয়ার বিষয়টিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে; অথচ নার্স এবং অন্যান্য অপরিহার্য কর্মীদের চলে যাওয়ার বিষয়টি খুব একটা গুরুত্ব পাচ্ছে না, অথচ তাদের হারানোটাও সমানভাবে ক্ষতিকর হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, উন্নয়ন ও প্রযুক্তির ওপর যে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়, তা ইসরায়েলি রাষ্ট্রের প্রকৃতি সম্পর্কে আরও মৌলিক একটি বিষয়কে সামনে নিয়ে আসে।

তিনি বলেন, “ইসরায়েলি অর্থনীতিবিদরা প্রায়ই বলে থাকেন যে, ইসরায়েলি রাষ্ট্রের টিকে থাকাটা গবেষণা ও উন্নয়নে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব বা সুবিধাজনক অবস্থান ধরে রাখার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু কেন? রোমানিয়ার মতো অন্যান্য রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে যদি বিষয়টি সত্য না হয়, তবে ইসরায়েলের ক্ষেত্রে কেন এমনটা হবে?”

“হয়তো এর কারণ হলো ইসরায়েলের সেই শ্রেষ্ঠত্ব বা সুবিধাজনক অবস্থানটি প্রয়োজন; কারণ শেষ পর্যন্ত এটি একটি ঔপনিবেশিক প্রকল্প।”

এমএইচ

সূত্র: আল জাজিরা 


Ekushey Television Ltd.

© ২০২৬ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি