ইবোলা ভাইরাস কীভাবে সবচেয়ে প্রাণঘাতী প্রাদুর্ভাবে পরিণত হলো
প্রকাশিত : ১৩:২২, ১৯ আগস্ট ২০২৬
একই রোগীর চিকিৎসার কয়েক দিনের মধ্যেই যখন হাসপাতালের দলের তিনজন সদস্য মারা যান, তখন ডা. রিচার্ড লোকুদু বুঝতে পেরেছিলেন—পরিস্থিতি হাতছাড়া হয়ে গেছে। গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গো (ডিআরসি) আনুষ্ঠানিকভাবে প্রাদুর্ভাব ঘোষণা করার বহু আগেই ভাইরাসটি গোপনে ছড়াতে শুরু করেছিল।
এপ্রিলের শুরুতে ইতুরি প্রদেশের মংবওয়ালু জেনারেল হাসপাতালে এক রোগীর অস্ত্রোপচার করা হয়। অস্ত্রোপচার সহকারী, অ্যানেস্থেটিস্ট এবং সেবা প্রদানকারী দলের ওই তিন সদস্যের মৃত্যুই ছিল ভয়াবহ এক মহামারীর প্রাথমিক সংকেত। পরবর্তীতে এটি ডিআর কঙ্গোর ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাণঘাতী ইবোলা প্রাদুর্ভাবে রূপ নেয়।
রেকর্ড ভাঙা সংক্রমণ ও মৃত্যুর মিছিল
স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রাদুর্ভাব ঘোষণার মাত্র তিন মাসের মধ্যে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে:
নিশ্চিত আক্রান্ত: ৪,৯০০ জনের বেশি, মোট মৃত্যু: ২,৩০০ জনের বেশি, এর আগে ২০১৮-২০২০ সালের প্রাদুর্ভাবে ‘জাইর স্ট্রেইন’-এর কারণে ২,২৯৯ জনের মৃত্যু হয়েছিল, যা এতদিন সর্বোচ্চ ছিল।
"কেবল ঈশ্বরই আমাদের এই বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে পারেন। একই সাথে নিরাপত্তাহীনতা, দুর্বল শাসনব্যবস্থা এবং দারিদ্র্যের মোকাবিলা করা কঠিন; আর এই প্রাণঘাতী মহামারীর কারণেও আমাদের ভুগতে হচ্ছে।"
ফুরাহা গিসেল (৩৫), স্থানীয় বাসিন্দা
চলতি প্রাদুর্ভাবটির পেছনে রয়েছে ‘বান্দিবুগিও ভাইরাস ডিজিজ’ (BVD)। ২০০৭ সালে উগান্ডায় প্রথম শনাক্ত হওয়া ইবোলার এই বিরল রূপটি চিকিৎসকদের জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কোনো প্রতিষেধক নেই: সাধারণ ‘জাইর স্ট্রেইন’-এর টিকা ও চিকিৎসা থাকলেও, বান্দিবুগিও-র জন্য কোনো অনুমোদিত টিকা বা সুনির্দিষ্ট ওষুধ নেই।
একমাত্র ভরসা: দ্রুত রোগী শনাক্তকরণ, সহায়ক চিকিৎসা সেবা, সংক্রমণ প্রতিরোধ এবং স্থানীয়দের সচেতনতা।
সংক্রমণ ছড়ানোর নেপথ্যে ৩টি প্রধান কারণ
১. প্রাদুর্ভাব শনাক্তে বিলম্ব:- গত ১৫ মে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেওয়ার আগেই বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ে। ইতুরি অঞ্চলে শুরুতে কোনো পরীক্ষাগার না থাকায় নমুনা পরীক্ষার জন্য বাইরে পাঠাতে হতো, যা সময়ক্ষেপণ ঘটিয়েছে।
২. অনিয়ন্ত্রিত জনস্রোত:- বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, অসুস্থ ব্যক্তিরা অবাধে আক্রান্ত এলাকা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে যাতায়াত করায় ভাইরাসের ভৌগোলিক বিস্তার দ্রুত ঘটেছে।
৩. সংঘাত ও নিরাপত্তাহীনতা:- খনিজ-সমৃদ্ধ ইতুরি অঞ্চলে কয়েক দশক ধরে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সংঘাত চলছে। যুদ্ধকবলিত এলাকায় ইবোলা প্রতিরোধকারী দলের পৌঁছানো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। গোলাগুলির ঘটনা ঘটলে স্বাস্থ্যকর্মীরা কেন্দ্র ছেড়ে যেতে বাধ্য হন।
কঙ্গো কর্তৃপক্ষের ইবোলা মোকাবিলায় দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থাকলেও এই প্রাদুর্ভাবের বহুমুখী সংকট সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ডিআরসি-তে ইবোলা মোকাবিলা কার্যক্রমের প্রধান অধ্যাপক পিয়েরে আকিলিমানি জানান, শুরুতে কোনো ল্যাব না থাকলেও বর্তমানে ইতুরি প্রদেশে ১২টিরও বেশি পরীক্ষাগার স্থাপন করা হয়েছে, যা রোগী শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া দ্রুত করেছে।
আফ্রিকা সিডিসি ও ডব্লিউএইচও বর্তমানে ওই অঞ্চলে নজরদারি, রোগী সেবা ও সংক্রমণ প্রতিরোধের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তবে যুদ্ধাবস্থা ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি না কমলে এই ভাইরাসের শৃঙ্খল ভাঙা কঠিন হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সুত্র: আল জাজিরা
আরও পড়ুন










